
অপূর্ব লাল সরকার, আগৈলঝাড়া (বরিশাল)
‘কায়দা রে কায়দা, ওরে কায়দা, কায়দার কায়দা-বাক্সের ভিতর লুকিয়ে আছে দুনিয়া, এসে দেখো ভাইয়েরা।’ ছন্দময় এই ডাকের সঙ্গে এক হাতে ডুগডুগি বাজিয়ে অন্য হাতে বায়োস্কোপের হাতল ঘুরিয়ে চলেছেন বরিশালের আগৈলঝাড়ার সর্বানন্দ মধু। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, কমেছে চলাফেরার সামর্থ্য; কিন্তু হারিয়ে যেতে বসা বায়োস্কোপের ঐতিহ্য এখনো ছাড়েননি তিনি।
আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধুর জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ৮১ বছর। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি মধ্যম। তাঁর বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। সংসারে অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। কৈশোরেই বাবার কাছ থেকে কাঠমিস্ত্রির কাজ শেখেন। পরে এটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
প্রায় ৫০ বছর আগে, তখন তাঁর বয়স ৩০ বছর। যশোরের বেনাপোল এলাকায় কাঠমিস্ত্রির কাজ করার সময় মাত্র ১৮ টাকায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বায়োস্কোপ কিনে নেন তিনি। পরে এর নাম দেন ‘কায়দারে কায়দা বায়োস্কোপ’। সেই থেকে শুরু হয় তাঁর বায়োস্কোপ দেখানোর পথচলা।
ডুগডুগির তালে ছন্দময় কথার সঙ্গে বায়োস্কোপের হাতল ঘুরিয়ে গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজার ও বিভিন্ন মৌসুমী মেলায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন সর্বানন্দ। তাঁর বায়োস্কোপ দেখতে প্রথম দিকে শিশুদের ভিড় লেগেই থাকত। বাক্সের ভেতর দিয়ে দর্শকদের দেখাতেন জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্বের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, পশুপাখিসহ নানা ধরনের ছবি।
একসময় দেশের গ্রামবাংলায় মেলা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান বিনোদন ছিল বায়োস্কোপ। ছোট্ট একটি বাক্সের ভেতর দিয়ে কয়েকজন দর্শক একসঙ্গে ছবি দেখতেন। ডুগডুগির শব্দ আর বায়োস্কোপওয়ালার ছন্দময় ডাক মিলিয়ে তৈরি হতো আলাদা এক আবহ।
কিন্তু সময় বদলেছে। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও আধুনিক নানা বিনোদনমাধ্যমের বিস্তারে বায়োস্কোপ হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেকের কাছে এটি এখন কেবল শৈশবের স্মৃতি। তবুও পুরোনো বায়োস্কোপের বাক্স কাঁধে নিয়ে আজও বিভিন্ন জেলা ও গ্রামের মেলা-অনুষ্ঠানে ছুটে যান সর্বানন্দ।
এই দীর্ঘ পথচলায় অভাবও ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। একসময় সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নিজের পড়াশোনার বই পর্যন্ত বিক্রি করে চাল কিনতে হয়েছিল। পরে বায়োস্কোপ দেখিয়ে উপার্জিত অর্থ দিয়ে ভাইবোনদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি নিজের জন্য জমিজমা ও সম্পদও গড়ে তুলেছেন।
সর্বানন্দ মধু বলেন, ‘বায়োস্কোপ শুধু আমার জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি আমার জীবনের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির যুগে এই বিনোদন মাধ্যম হারিয়ে গেলেও আমি যতদিন সক্ষম, ততদিন মানুষের সামনে বায়োস্কোপের ঐতিহ্য তুলে ধরতে চাই।’
বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো দূর-দূরান্তে যেতে পারেন না সর্বানন্দ। তারপরও বায়োস্কোপের বাক্সটি কাঁধে তুলে কোথাও হাজির হলেই তাঁর ছন্দময় ডাক শুনে কৌতূহলী হয়ে ছুটে আসে শিশু-কিশোরেরা। বাক্সের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে ছবি দেখার সেই পুরোনো অভিজ্ঞতা তাদের কাছে নতুন হলেও বয়স্ক দর্শকদের মনে জাগিয়ে তোলে হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি।
পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বায়োস্কোপকে জীবিকার পাশাপাশি নিজের জীবনের অংশ করে নিয়েছেন সর্বানন্দ মধু। তাঁর হাতে থাকা পুরোনো বাক্সটি তাই শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; এটি গ্রামীণ বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত স্মারক। যতদিন তাঁর হাতে ডুগডুগি বাজবে, যতদিন ঘুরবে বায়োস্কোপের হাতল, ততদিন হয়তো তাঁর সঙ্গে বেঁচে থাকবে এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গল্প।