
সাগরকন্যা ডেস্ক
রাজধানীর মহানগর প্রজেক্টের এক ব্যস্ত সকাল। সাত মাসের শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে চিন্তিত তানিয়া আক্তার। কর্মজীবী এই মায়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, সন্তানকে নিরাপদ হাতে রেখে কর্মস্থলে যাওয়া। স্বামী একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। যৌথ পরিবারের কাঠামো ভেঙে যাওয়া এবং নগরজীবনের ব্যস্ততায় শিশুর দেখাশোনার জন্য পাশে ছিলেন না কোনো স্বজন। শেষ পর্যন্ত একজন পেশাদার কেয়ারগিভারই হয়ে ওঠেন তার ভরসার জায়গা।
অন্যদিকে, মিরপুরের মোহাম্মদ রেদোয়ানের পরিবারের সংকটটি ছিল ভিন্ন ধরনের। তাঁর নানি বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যার পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল নিয়মিত ফিজিওথেরাপি, ওষুধ সেবনের তদারকি এবং মানসিক সাহচর্য। পরিবারের সদস্যরা পাশে থাকলেও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে প্রশিক্ষিত একজন সেবাদানকারীর। সেই প্রয়োজন পূরণ করছেন একজন কেয়ারগিভার।
তানিয়া ও রেদোয়ানের অভিজ্ঞতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বাড়ছে পেশাদার কেয়ারগিভারের চাহিদা। একসময় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তির সেবাকে পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে এটি পরিণত হচ্ছে সম্ভাবনাময় একটি পেশায়।
বদলে যাচ্ছে সেবার ধরন
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে শিশু, অসুস্থ ও প্রবীণদের দেখাশোনার বড় দায়িত্ব পালন করেছেন পরিবারের নারী সদস্যরা। তবে নারীশিক্ষার প্রসার, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৩৭ লাখ। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ায় পরিবারের ভেতরে প্রচলিত সেবাব্যবস্থায় নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সন্তানদের কর্মসংস্থান বা উচ্চশিক্ষার জন্য বড় শহর কিংবা বিদেশে চলে যাওয়ার কারণে অনেক প্রবীণ মানুষ একাকিত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যায় প্রবীণের সংখ্যা আগামী দশকগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রবীণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে পারেন।
আইএলওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সেবা খাতে ৩০ কোটির বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশেও এ খাতে ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। হাসপাতাল, ডে-কেয়ার সেন্টার ও বাসাবাড়িতে বাড়তে থাকা চাহিদা কেয়ারগিভিং পেশাকে এগিয়ে নিচ্ছে।
চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও কেয়ারগিভার- চিকিৎসাসেবার এই তিনটি স্তরের দায়িত্ব আলাদা হলেও তারা একে অপরের পরিপূরক।
তিনি বলেন, চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসার পরিকল্পনা করেন। নার্সরা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ, ইনজেকশন দেওয়া ও ড্রেসিংয়ের মতো ক্লিনিক্যাল দায়িত্ব পালন করেন। আর কেয়ারগিভারের প্রধান দায়িত্ব হলো রোগীর দৈনন্দিন ব্যক্তিগত পরিচর্যা নিশ্চিত করা।
ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী কিংবা নিজের দৈনন্দিন কাজ নিজে করতে অক্ষম রোগীদের জন্য প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
প্রশিক্ষণে বদলেছে জীবন
কেয়ারগিভিং শুধু সেবার পেশাই নয়, অনেকের জন্য এটি আত্মনির্ভরতার পথও তৈরি করেছে। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা মোহাম্মদ রায়হান এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারেন ‘ইউসেপ বাংলাদেশ’-এর কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ কোর্সের কথা।
প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তাঁর জীবনে আসে পরিবর্তন। কোর্স শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির জব প্লেসমেন্ট সহায়তায় ‘বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হসপিটালে’ চাকরি পান তিনি। বর্তমানে ওভারটাইম ও অন্যান্য সুবিধাসহ তাঁর মাসিক আয় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। পরিবারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ও করছেন তিনি।
একইভাবে নিজের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এগিয়ে এসেছেন শাবানা খাতুন। বাবার আকস্মিক মৃত্যু এবং পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের দেখাশোনা করতে গিয়ে সেবাধর্মের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। অর্থাভাবে নার্স হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও থেমে থাকেননি তিনি।
দিনে চাকরি এবং রাতে পড়াশোনা চালিয়ে প্যারামেডিকেলে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন শাবানা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার পাশাপাশি বারডেম হাসপাতালে কেয়ারগিভার হিসেবে কাজ করছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শাবানা বলেন, ‘আমি এমন একজন রোগীর পরিচর্যার দায়িত্ব নিয়েছিলাম, যার শরীরে পচন ধরেছিল। আন্তরিক সেবায় রোগীর পরিবার সন্তুষ্ট হয়। প্রথম মাসেই প্রতিষ্ঠান আমার বেতন ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার টাকা করে।’
তার মতে, শুধু ওষুধে রোগীর সম্পূর্ণ সুস্থতা আসে না, প্রয়োজন সহানুভূতি ও মানবিক যত্ন।
প্রযুক্তির যুগেও প্রয়োজন মানবিক স্পর্শ
সাজিদা ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ ও প্রশাসনিক বিভাগের কর্মকর্তা সৈকত তালুকদার জয় বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক যান্ত্রিক কাজের বিকল্প হতে পারে, কিন্তু কেয়ারগিভিংয়ের বিকল্প হতে পারে না। কারণ এই সেবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের আবেগ ও আন্তরিকতা।’
সাজিদা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের সঙ্গে প্রায় ২০০ জন প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার কাজ করছেন। গত আট বছরে সংস্থাটির মাধ্যমে সহস্রাধিক কেয়ারগিভার এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে জাতীয় দক্ষতা কাঠামোর লেভেল-২ ও লেভেল-৩ সনদধারীদের গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে রোগীর সঙ্গে আচরণ, সময়ানুবর্তিতা ও মানসিক সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বদলাতে হবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
কেয়ারগিভিং পেশার সম্ভাবনা বাড়লেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রেই কেয়ারগিভারদের সাধারণ গৃহকর্মী বা আয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়। অথচ এটি প্রশিক্ষণনির্ভর একটি পেশা, যেখানে প্রয়োজন কারিগরি জ্ঞান, ধৈর্য ও মানবিক দক্ষতা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ বলেন, শয্যাশায়ী রোগীকে নিয়মিত পরিচর্যা না করলে শরীরের নির্দিষ্ট অংশে রক্ত চলাচল কমে গিয়ে ক্ষত তৈরি হতে পারে। এসব বিষয়ে প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তিনি বলেন, সেবা খাতকে আরও কার্যকর ও পেশাদার করতে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, নীতিমালা এবং যথাযথ সংস্কার।
পরিবারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় কেয়ারগিভিং এখন শুধু প্রয়োজনের সেবা নয়, বরং দক্ষতা ও মানবিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সম্ভাবনাময় কর্মক্ষেত্র।