
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, গলাচিপা (পটুয়াখালী)
বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবির ঘটনার ৪২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ ৬ জেলের কোনো সন্ধান মেলেনি। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ, স্থানীয় জেলে ও আশপাশের মাছ ধরার ট্রলারগুলোর সমন্বয়ে টানা উদ্ধার অভিযান চললেও মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মঙ্গলবার সরেজমিনে উপজেলার খরিদা ও তুলারাম গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিখোঁজ জেলেদের পরিবারগুলোতে বিরাজ করছে শোক, উৎকণ্ঠা ও অপেক্ষার প্রহর। স্বজনরা প্রিয়জনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন।
ডুবে যাওয়া ট্রলারটিতে ১১ জন জেলে ছিলেন। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন- পানপট্টি ইউনিয়নের তুলারাম গ্রামের কেতাব আলী খাঁর ছেলে এমাদুল খাঁ (৪৫), খরিদা গ্রামের গেদু হাওলাদারের ছেলে হারুন (৪৫), গজালিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইছাদী গ্রামের মৃত করিম সিকদারের ছেলে ফোরকান সিকদার (৫৫), তার ছেলে সায়েম (২০), মৃত চান মিয়া হাওলাদারের ছেলে আল-আমিন (২২) এবং গলাচিপা সদর ইউনিয়নের পক্ষিয়া গ্রামের নাসির উদ্দিনের ছেলে আক্কাস (২৫)।
উদ্ধার হওয়া ট্রলার মালিক এমাদুল সিকদার বলেন, ট্রলার উল্টে যাওয়ার পর ভেতরে আটকে পড়া জেলেদের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু উত্তাল ঢেউ ও প্রবল স্রোতের কারণে কাউকে উদ্ধার করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। কিছুক্ষণ পর ছয়জন ট্রলার থেকে বের হতে পারলেও ফোরকান, সায়েম ও এমাদুল খাঁ আর বের হতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, আমরা আটজন ট্রলারের ফ্যান ধরে প্রায় ছয় ঘণ্টা ভেসে ছিলাম। পরে জীবন বাঁচাতে পাঁচজন একটি ফ্লুট ধরে অন্যদিকে ভেসে যাই। পরে একটি মাছ ধরার ট্রলার আমাদের উদ্ধার করে। শেষবার হারুন, আল-আমিন ও আক্কাসকে উল্টে থাকা ট্রলারের ফ্যানের কাছেই দেখেছিলাম।
উদ্ধার হওয়া আরেক জেলে বায়েজিদ সাগরকন্যাকে বলেন, হঠাৎ করেই আবহাওয়া ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি ডুবে যায়। আমরা ট্রলারের ভাঙা অংশ ও একটি বয়া ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাগরে ভেসে ছিলাম। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর উত্তাল ঢেউ। মনে হচ্ছিল আর বাঁচব না।
নিখোঁজ জেলে হারুনের স্বজনরা জানান, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সাগরে মাছ ধরছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে কখনো এমন দুর্ঘটনার মুখোমুখি হননি। এখন তাদের একমাত্র প্রার্থনা, তিনি যেন জীবিত ফিরে আসেন।
এদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিখোঁজ প্রত্যেক জেলের পরিবারকে প্রাথমিক সহায়তা হিসেবে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া সোমবার ট্রলার মালিক ও উদ্ধার হওয়া জেলে এমাদুল সিকদারের বাবা মো. ইদ্রিস সিকদার গলাচিপা থানায় এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
কোস্ট গার্ডের একটি সূত্র জানায়, আবহাওয়া অনুকূলে এলে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হবে। পাশাপাশি আশপাশে অবস্থানরত সব মাছ ধরার ট্রলারকে সতর্ক থাকতে এবং নিখোঁজদের সন্ধান পেলে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুয়াকাটা নৌ-পুলিশের পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে নৌ-পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, ট্রলারডুবির খবর পাওয়ার পরপরই রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। কোস্ট গার্ড নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে। স্থানীয় মাছ ধরার ট্রলারগুলোও অনুসন্ধানে অংশ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আহতদের চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি নিখোঁজ প্রত্যেক জেলের বাড়িতে গিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিয়েছি এবং প্রত্যেক পরিবারকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি আহত জেলেদেরও দেখে এসেছি।’ এ সময় উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল নবী, উপজেলা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন এবং মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর প্রতিনিধি আবু নাঈম উপস্থিত ছিলেন।