অনিয়ম নিয়েও উঠছে প্রশ্ন বেনাপোল কাস্টমসে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি

হোম » খুলনা » অনিয়ম নিয়েও উঠছে প্রশ্ন বেনাপোল কাস্টমসে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি
রবিবার ● ৫ জুলাই ২০২৬


 

বেনাপোল কাস্টমসে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি

দেবুল কুমার দাস, বেনাপোল (যশোর) থেকে

 

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।

 

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, একই সময়ে বন্দর দিয়ে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা এবং আমদানির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন কমেছে।

 

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা করা হয়। তবে বছর শেষে আদায় হয় ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কম।

 

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৭০৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

 

কাস্টমস ও বন্দর-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে ব্যবসায়ী মহলের একাংশের দাবি, মিথ্যা পণ্য ঘোষণা, ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে কারসাজি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস, শেড থেকে পণ্য আত্মসাৎ, ভুয়া এন্ট্রি পাস ব্যবহার এবং সংঘবদ্ধভাবে শুল্ক ফাঁকির ঘটনাও রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত এক মাসে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা প্রায় ১৫ কোটি টাকার বিভিন্ন পণ্যের চালান আটক করা হয়েছে। সম্প্রতি একই ভারতীয় খালি ট্রাকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ওজন রেকর্ড পাওয়া, বেকিং পাউডারের ঘোষণার আড়ালে শাড়ি ও থ্রি-পিস জব্দ, ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে উচ্চ শুল্কের পণ্য উদ্ধার এবং কেমিক্যাল জোন থেকে পণ্য সরিয়ে নেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

 

এসব ঘটনায় কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক তদন্ত শুরু করেছে। শুল্ক ফাঁকি, পণ্য পাচার ও সরকারি মালামাল আত্মসাতের অভিযোগে সম্প্রতি চারটি মামলাও হয়েছে। মামলাগুলোতে কাস্টমস কর্মকর্তা, বন্দর কর্মকর্তা, আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও ট্রাকচালকসহ মোট ৫৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

 

এদিকে বিজিবির এক অভিযানে সরকারি নিলামের পণ্য কাস্টমসের নিজস্ব গুদাম থেকে পাচারের সময় এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ তিনজনকে আটক করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

 

সম্প্রতি কাস্টমসের একটি দাপ্তরিক চিঠিতে বন্দরের একটি ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই সময়ে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের জন্য দুই ধরনের ওজন প্রদর্শনের তথ্য উঠে আসে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চালান আটকের পাশাপাশি তদন্ত শুরু হয়েছে।

 

অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।

 

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, কাস্টমসের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওজনযন্ত্রের তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অভিযুক্তদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, বন্দরের শেডের ভেতরে পণ্য আত্মসাৎ বা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটলে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকাও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে একই ধরনের অনিয়ম বন্ধ হবে না।

 

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, রাজস্ব ফাঁকি রোধে কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। ওজনস্কেলে কারসাজি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তে প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৩৯:২৫ ● ১৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ