
হোসাইন আমির
বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র ‘সাগরকন্যা’ কুয়াকাটা। সমুদ্রের বুকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অনন্য দৃশ্য দেখতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। পর্যটন শিল্পে কুয়াকাটার গুরুত্ব দিন দিন বাড়লেও বাস্তবতা হলো, নগরীর প্রবেশমুখেই এখন চোখে পড়ে অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত দখল এবং পরিবেশগত বিশৃঙ্খলার চিত্র। ফলে প্রশ্ন উঠছে- কুয়াকাটার দেখভালের দায়িত্ব আসলে কার?
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, কুয়াকাটার প্রবেশদ্বারে স্থাপিত ‘ওয়েলকাম কুয়াকাটা’ তোরণের পাশেই গড়ে উঠেছে কয়েকটি কাঠের চেরাই কারখানা। পাশাপাশি বাসস্ট্যান্ড এলাকার ভেতরে যাত্রীছাউনি ও আশপাশে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রমেও রয়েছে শৈথিল্য। মহাসড়কের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে কাঠের গুঁড়ি ও টুকরো, যা পুরো প্রবেশপথের সৌন্দর্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একটি পর্যটন নগরীর প্রবেশদ্বারই তার পরিচয়ের প্রথম বার্তা বহন করে। সেখানে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও নান্দনিকতা থাকা আবশ্যক। কিন্তু কুয়াকাটার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তার বিপরীত চিত্র। দীর্ঘদিন ধরে এমন অব্যবস্থাপনা চললেও কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে।
প্রশ্ন হলো, পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে যখন কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, তখন নগরীর প্রবেশমুখের এমন বেহাল অবস্থা কেন? প্রশাসনের নজরদারির আওতায় থাকা একটি এলাকায় কীভাবে বছরের পর বছর অবৈধ স্থাপনা ও পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চলতে পারে- এ প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতাও আশাব্যঞ্জক নয়। কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা অনেকেই মনে করেন, একটি পর্যটন শহরের প্রথম ছাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবেশমুখেই যদি বিশৃঙ্খলা ও অপরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ে, তবে তা পুরো এলাকার ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও এটি নেতিবাচক বার্তা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরামের নেতারা দীর্ঘদিন ধরেই এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। তাঁদের মতে, জাতীয় পর্যায়ে কুয়াকাটার উন্নয়ন নিয়ে নানা পরিকল্পনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার যথাযথ বাস্তবায়ন নেই। বিশেষ করে সৌন্দর্য রক্ষা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনায় সমন্বিত উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।

অবশ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে কুয়াকাটাবাসীর প্রত্যাশা, এসব আশ্বাস কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপে প্রতিফলিত হোক।
কুয়াকাটা শুধু একটি সমুদ্রসৈকত নয়; এটি বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম প্রতীক। তাই এর প্রবেশপথে অব্যবস্থাপনা কিংবা অপরিকল্পিত দখলদারিত্ব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কুয়াকাটার সৌন্দর্য রক্ষা করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরও যৌথ দায়িত্ব।
আজ প্রয়োজন দায়সারা আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ। কারণ একটি পর্যটন নগরীর প্রকৃত সৌন্দর্য শুরু হয় তার প্রবেশদ্বার থেকেই। আর সেই প্রবেশদ্বার যদি অবহেলার প্রতীক হয়ে ওঠে, তবে ‘সাগরকন্যা’ কুয়াকাটার ব্র্যান্ড মূল্যও প্রশ্নের মুখে পড়বে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সংকেত কতটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে।
লেখক: দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টার ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক