বিজ্ঞান ছাড়া বিচার নয়: ভোলার জেলেদের অধিকার ও ইলিশ ব্যবস্থাপনার সংকট !

হোম » মতামত » বিজ্ঞান ছাড়া বিচার নয়: ভোলার জেলেদের অধিকার ও ইলিশ ব্যবস্থাপনার সংকট !
রবিবার ● ১৭ মে ২০২৬


 

মৎস্যবিদ মো: সাইদুর রহমান,

মৎস্যবিদ মো: সাইদুর রহমান,

 

বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা ভোলার লক্ষাধিক ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী প্রতিদিন তাঁদের ধরা মাছের বৈধতা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন। বর্তমান ইলিশ (Tenualosa ilisha) সংরক্ষণ বিধিমালায় ‘সামুদ্রিক’ ও ‘নদীর’ ইলিশের মধ্যে যে পার্থক্য করা হয়, তা প্রয়োগ হয় সম্পূর্ণ দৃষ্টিগ্রাহ্য ও অবৈজ্ঞানিক পরিদর্শনের মাধ্যমে - যেখানে এই প্রজাতির anadromous জীবনচক্রের কারণে এমন পার্থক্য নির্ণয় জৈবিকভাবেই অসম্ভব। এই ভাষ্যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া প্রয়োগকৃত এই আইন মৎস্যজীবী সমাজের প্রতি অবিচার। পাশাপাশি, জিআইএস-ভিত্তিক মৎস্য অঞ্চল চিহ্নিতকরণ, আঞ্চলিক পরীক্ষাগার স্থাপন এবং মানসম্মত যাচাই প্রোটোকলসহ সাক্ষ্যনির্ভর নীতি সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

 

মূলশব্দ: ইলিশ; Tenualosa ilisha; মৎস্য ব্যবস্থাপনা; বাংলাদেশ; উপকূলীয় জীবিকা; ওটোলিথ মাইক্রোকেমিস্ট্রি; anadromous মাছ

 

১. ভূমিকা

 

ভোলার চরফ্যাশনের জেলে জামাল মিয়া ভোরের আলো ফোটার আগেই মেঘনায় জাল ফেলেন। সন্ধ্যায় নৌকা ভরা ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরার পরও অপেক্ষায় থাকে এক অনিশ্চিত পরিণতি - মাছ বাজেয়াপ্তের আশঙ্কা। কারণ? প্রয়োগকারী কর্মকর্তার চোখের সামনে চলে একটি দৃষ্টিগ্রাহ্য পরীক্ষা: তাঁর ধরা ইলিশ ‘সামুদ্রিক’ কি না, যা মৌসুমী বা স্থানিক বিধিনিষেধের আওতায় পড়ে, নাকি ‘নদীর’ ইলিশ, যা ভোলার উপকূলীয় নদীগুলোতে ধরা সম্পূর্ণ বৈধ।

 

এই একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই উপকূলীয় বাংলাদেশের লক্ষাধিক মৎস্যজীবী পরিবারের জীবিকায় এক গভীর ও চলমান সংকট তৈরি হয়েছে। এই ভাষ্যে মৎস্যবিজ্ঞানের আলোকে পরীক্ষা করা হয়েছে - এই পার্থক্যের জৈবিক ভিত্তি আদৌ আছে কি না, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ওপর এর প্রভাব কী, এবং সাক্ষ্যনির্ভর সংস্কারের পথ কোনটি।

 

২. একটি প্রজাতি, দুটি আইনি পরিচয়: জৈবিকভাবে অসম্ভব একটি বিভাজন

 

ইলিশ (Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং দেশের ক্ষুদ্র মৎস্য অর্থনীতির মূল স্তম্ভ। বর্তমান বিধিকাঠামোতে এই মাছের দুটি আইনি পরিচয় রয়েছে: নদীর ইলিশ, যা মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার মতো নদীতে ধরা বর্তমান সময়ে বৈধ; এবং সামুদ্রিক ইলিশ, যা নির্দিষ্ট সামুদ্রিক অঞ্চলে মৌসুমী ও স্থানিক বিধিনিষেধের আওতাভুক্ত।

 

কিন্তু মূল সমস্যা হলো - বাস্তবে এই সীমারেখা টানা জৈবিকভাবেই অসম্ভব। ইলিশ একটি anadromous প্রজাতি: জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি সমুদ্র ও নদীর মধ্যে অবাধে যাতায়াত করে। ডিম পাড়তে প্রাপ্তবয়স্ক মাছ সমুদ্র থেকে নদীতে ওঠে; জাটকা মিঠাপানিতে বড় হয়ে আবার সমুদ্রে ফেরে। ফলে যেকোনো মুহূর্তে একটি মাছ ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তা শুধু দেখে বলা সম্ভব নয়।

 

৩. বিজ্ঞান আছে - কিন্তু ঘাটে নেই

 

আধুনিক মৎস্যবিজ্ঞানে ইলিশের আবাস-ইতিহাস নির্ধারণের জন্য কয়েকটি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি রয়েছে। ওটোলিথ মাইক্রোকেমিস্ট্রি - কানের হাড়ের (otolith) রাসায়নিক বিশ্লেষণ - স্ট্রোনশিয়াম-ক্যালসিয়াম অনুপাতের মতো মৌলিক সংকেতের মাধ্যমে সামুদ্রিক ও মিঠাপানির আবাস নির্ভরযোগ্যভাবে আলাদা করতে পারে। এর পাশাপাশি স্থিতিশীল আইসোটোপ বিশ্লেষণ (বিশেষত δ¹³C ও δ¹⁵N) এবং ফ্যাটি অ্যাসিড প্রোফাইলিং পদ্ধতিও যথেষ্ট নির্ভুলতায় পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাসের ইতিহাস তুলে ধরতে সক্ষম।

 

কিন্তু এই সব পদ্ধতি সম্পূর্ণ ল্যাবরেটরি-নির্ভর। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (BFRI), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (BAEC) ও ফিশারিজ বিভাগ রয়েছে এই ধরনের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে আংশিকভাবে এই বিশ্লেষণ-সক্ষমতা থাকলেও চরফ্যাশনের ঘাটে বা মনপুরার নদীতে কোনো মাঠ-পর্যায়ের যাচাই ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ যে পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়, সেই পরীক্ষা না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

 

৪. ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

 

বর্তমান প্রয়োগ-পদ্ধতি পদ্ধতিগত ও মৌলিক ন্যায়বিচারের গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয়। যে জেলে বৈধ জলাভূমিতে মাছ ধরেছেন, অথচ সেটি প্রমাণ করার কোনো সুযোগ নেই - এবং রাষ্ট্র বাজেয়াপ্তের আগে বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের কোনো দায় বহন করে না - সেই ব্যবস্থায় মূলত প্রমাণের ভার উল্টে দেওয়া হয়েছে। মেনে চলার প্রমাণ দেওয়া অসম্ভব; দোষ ধরে নেওয়া হয়।

 

এটি কেবল বিমূর্ত আইনি প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশে ইলিশ মৎস্যখাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখ জেলে জড়িত, মূল্যশৃঙ্খলে নির্ভরশীল কোটি মানুষ। এই পরিবারগুলোর জন্য একদিনের ধরা মাছ অন্যায়ভাবে বাজেয়াপ্ত হওয়া কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক অসুবিধা নয় - এটি একটি জরুরি অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এমন স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগের বারবার শিকার হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য যে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দরকার, তা-ও হ্রাস পায়।

 

৫. সাক্ষ্যনির্ভর সংস্কারের পথ

 

সমস্যার সমাধান আছে - তবে তার জন্য চাই সুচিন্তিত, ধাপে ধাপে নীতি-প্রতিক্রিয়া:

 

i. জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহারে মৎস্য অঞ্চল সীমানা নির্ধারণ। আইনগতভাবে সংজ্ঞায়িত সামুদ্রিক ও নদীর মৎস্য অঞ্চলগুলো স্থানিকভাবে চিহ্নিত, সর্বসাধারণের জন্য মানচিত্রে প্রকাশিত এবং জেলেদের কাছে বোধগম্য ভাষায় পৌঁছে দিতে হবে।

 

ii. বাজেয়াপ্তের আগে বৈজ্ঞানিক যাচাই প্রোটোকল চালু করা। মাছের উৎস বিতর্কিত হলে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ ও ল্যাবরেটরি যাচাই সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বাজেয়াপ্তি স্থগিত রাখার আনুষ্ঠানিক বিধান প্রণয়ন করতে হবে।

 

iii. আঞ্চলিক মৎস্য পরীক্ষাগার স্থাপন। বিদ্যমান BFRI সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বিকেন্দ্রীভূত উপকূলীয় পরীক্ষাগার অবকাঠামোতে বিনিয়োগ দ্রুত, স্থানীয় যাচাই নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে সাক্ষ্যনির্ভর মৎস্য প্রশাসনের ভিত গড়বে।

 

iv. মাঠ কর্মকর্তাদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন। সন্দেহজনক লঙ্ঘন কখন ও কীভাবে মূল্যায়ন করতে হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বর্তমান বিবেচনামূলক দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিদর্শনের বদলে সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যনির্দেশিকা প্রয়োজন।

 

৬. উপসংহার

 

ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়। এটি লক্ষ লক্ষ উপকূলীয় পরিবারের জীবিকা, একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও নীল অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমান বিধিমালার উদ্দেশ্য অবশ্যই সঠিক ও প্রয়োজনীয় - একটি চাপের মুখে থাকা সম্পদকে রক্ষা করা। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়া আইন রক্ষা করে না - ক্ষতি করে। যাচাইযোগ্য ভিত্তি ছাড়া প্রয়োগকৃত বিধিমালা মৎস্য ব্যবস্থায় সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশীজনদের - ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের - স্বেচ্ছাচারী ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা নষ্ট করে এবং শেষ পর্যন্ত যে সম্পদ রক্ষার কথা সেটিকেই বিপন্ন করে।

 

ইলিশ ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞান ও মানবিকতার ওপর দাঁড় করানোর এখনই সময়। বৈজ্ঞানিক হাতিয়ার প্রস্তুত আছে। নীতিসমাধান বাস্তবসম্ভব। যা দরকার তা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা।

 

লেখক পরিচিতি

 

মো: সাইদুর রহমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি বিভাগ থেকে বিএসসি (অনার্স) ও এমএসসি ডিগ্রিধারী মৎস্যবিদ। তাঁর গবেষণার বিষয়: মৎস্য বাস্তুসংস্থান, উপকূলীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্যবিজ্ঞান ও নীতির সংযোগস্থল।

 

বি.দ্র.: এই লেখার বিষয়বস্তু সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব মতামত। এর কোনো বক্তব্য বা মন্তব্যের  দায় সাগরকন্যা’র নয়। 

বাংলাদেশ সময়: ২৩:১০:০৭ ● ২১ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ