ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছাত্ররা নেই, পদে সন্তানের বাবা-মায়েরা: বিএনপি কোন পথে?

হোম » মতামত » ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছাত্ররা নেই, পদে সন্তানের বাবা-মায়েরা: বিএনপি কোন পথে?
বৃহস্পতিবার ● ৭ মে ২০২৬


 

নূরুজ্জামান মামুন

নূরুজ্জামান মামুন

 

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মাত্র ৪১ বছর বয়সে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৩৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন এবং ৪৫ বছর বয়সে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। বর্তমান বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৩৪ বছর বয়সে, ২০০২ সালে, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী।

 

অর্থাৎ বিএনপির এই তিন প্রধান নেতৃত্বই গড়ে ৪০ বছরের মধ্যেই দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন। অথচ শহীদ জিয়ার আদর্শে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বয়স এখন ৩৮ বছর। তিনি ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৪ সালের ২ মার্চ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পান। বর্তমানে তাঁর কোথাও ছাত্রত্ব নেই। ১৯৮৮ সালের ২০ জানুয়ারি জন্ম হওয়ায় তাঁর বয়স এখন প্রায় ৩৮ বছর।

 

গত শনিবার ঘোষিত ৪৫টি ইউনিট কমিটিতে দেখা গেছে, অনেক নেতার বয়স ৪০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটিতে সহ-সভাপতির পদ পেয়েছেন আমার এলাকা পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার সন্তান ছোট ভাই জাকির হোসেন জাকির। সংবাদটি শুনে প্রথমে আনন্দিত হয়েছিলাম। অভিনন্দন জানানোর সময় হঠাৎ প্রশ্ন করি- ‘বুড়ো বয়সে ছাত্রদলের নেতা হলে যুবদল বা মূল দলে কবে যাবে? এমপি-মন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বই বা কবে নেবে?’

 

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর জাকির বলল, কমিটি দিচ্ছে বলেই করছি। ছাত্রদল করার বয়স তো অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। ফ্যাসিস্ট আমলে আমার ত্যাগের মূল্যায়ন করেছে দল। এখন আমার কী করার আছে?

 

ওর প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারিনি।

 

খোঁজ নিয়ে জানলাম, জাকির ২০০২ সালে এসএসসি পাস করেছে। জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি। অর্থাৎ তাঁর বয়স এখন ৩৯ বছরেরও বেশি। ২০২০ সালে তিনি বিয়ে করেছেন, এক সন্তানের জনক। অন্তত এক দশক আগে থেকেই ব্যাংকে চাকরি করেছেন, বর্তমানে ব্যবসা করছেন। কোথাও তাঁর ছাত্রত্ব নেই। উপরন্তু তিনি এলাকার একটি মাদরাসার সভাপতিও।

 

আমি জাকিরকে ছোট করার জন্য এই উদাহরণ টানিনি। বরং দেশের একসময়ের গৌরবময় ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের বর্তমান করুণ চিত্র তুলে ধরতেই তাঁর উদাহরণ দিয়েছি।

 

গত শনিবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন স্বাক্ষরিত ৪৫টি ইউনিট কমিটি একযোগে ঘোষণা করা হয়। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জেলা ও মহানগরে এসব কমিটি দেওয়া হয়েছে। এসব কমিটিতে জাকির হোসেনের মতো অসংখ্য নেতা পদ পেয়েছেন, যাদের বয়স ৩৫ থেকে ৪০ বছরের ওপরে। অথচ অনেক ত্যাগী ও নিয়মিত ছাত্র এসব কমিটিতে স্থান পাননি।

 

এ ঘটনায় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঞ্চিত নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ জানান। নয়াপল্টন বিএনপি কার্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও হয়। স্লোগান ওঠে-

‘টাকা লাগলে টাকা নে, তবু নাছির নতুন কমিটি দে।’

 

বঞ্চিতদের অভিযোগ, দুঃসময়ের ত্যাগীদের বাদ দিয়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদেরও পদ দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ২২ সদস্যের কমিটিতে আটজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যান্য ইউনিটেও ছাত্রলীগ ও গুপ্ত শিবিরের অনুপ্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা মিললে তা ছাত্রদল তথা বিএনপির জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হতে পারে।

 

মজার বিষয় হলো, ছাত্রদলের প্রধান প্রতিপক্ষ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে পদপ্রত্যাশীদের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ২৭ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্মেলন বিলম্বিত হলে কখনও তা ২৯ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অথচ বিএনপি আজ পর্যন্ত ছাত্রদলের নেতাদের জন্য সুস্পষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করতে পারেনি। ফলে নিয়মিত ছাত্ররা নেতৃত্বে আসতে পারছে না। ছাত্রদলের নেতৃত্বে এখন বিবাহিত ও সন্তানের পিতা-মাতারা।

 

এ ধরনের নেতৃত্ব নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারছে না। এর ফলও স্পষ্ট- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি।

 

অথচ ছাত্র রাজনীতিকে যুগোপযোগী ও গুণগতভাবে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়েই ‘শিক্ষা, ঐক্য ও প্রগতি’ এই তিন মূলনীতি সামনে রেখে ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ও ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সংগঠনটি একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তীতে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসেবেও পরিচিতি পায় ছাত্রদল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম- সবক্ষেত্রেই ছাত্রদল নেতৃত্ব দিয়েছে।

 

তবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী হামলা, মামলা, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁদের অনেকেরই সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না।

 

একসময় মেধাবী শিক্ষার্থীরা শহীদ জিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রদল করত। আমিও ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করেছি, নেতৃত্ব দিয়েছি। পাঁচ-দশ টাকার রং চা ভাগাভাগি করে খেয়ে সংগঠন করেছি। তখন ছাত্রনেতাদের সবচেয়ে বড় ‘ক্ষমতা’ ছিল সিনেমা হলের পাস দেওয়া। টাকা কামানোর চিন্তা কেউ করত না।

 

কিন্তু এখন ছাত্রদলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ শোনা যায়।

 

আমার কলাপাড়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কাজী ইয়াদুল ইসলাম তুষারের কথাই ধরা যাক। জুলাই বিপ্লবের আগে তিনি একটি এনজিওতে স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন। শেখ হাসিনার পতনের খবর শুনে দ্রুত মোটরসাইকেলে কলাপাড়ায় ছুটে যান। তখন হেলমেট পরার সময়ও ছিল না তাঁর। অথচ আজ সেই তুষার কোটি কোটি টাকার মালিক। পায়রা সমুদ্রবন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে কোটি কোটি টাকার কাজ চলছে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। ইয়াবা ব্যবসা, ডিজেল পাচারসহ নানা অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। শুধু তুষার নন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ছাত্রদলের অনেক নেতার বিরুদ্ধেই হঠাৎ বিত্তশালী হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

 

বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও ছাত্রদলের হারানো গৌরব ও সুনাম ফিরিয়ে আনার দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

 

ছাত্রদলের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে প্রকৃত ছাত্রদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে হবে। বিবাহিত ও অছাত্রদের দিয়ে গঠিত কমিটি দ্রুত ভেঙে দিতে হবে। গুপ্ত শিবির ও ছাত্রলীগের অনুপ্রবেশ কঠোরভাবে ঠেকাতে হবে। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাই করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার মাধ্যমে দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে, যারা ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্ব দেবে।

 

একই সঙ্গে ছাত্রবিষয়ক দায়িত্বেও ক্লিন ইমেজের সাবেক ছাত্রনেতাদের নিয়ে আসতে হবে।

 

শেষে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জামায়াত আন্দোলনে নামে, আওয়ামী লীগ সেই দাবিকে সমর্থন দিয়ে দেশ অচল করে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। ভবিষ্যতেও যেকোনো ইস্যুতে গুপ্ত জামায়াত-শিবির ও আওয়ামী লীগ একসঙ্গে মাঠে নামতে পারে। তাদের মোকাবিলা করতে হলে ছাত্রদলকে সংগঠিত, আধুনিক ও ছাত্রবান্ধব সংগঠন হিসেবে পুনর্গঠন করার বিকল্প নেই।

 

লেখক: কানাডাপ্রবাসী গণমাধ্যমকর্মী

 

(প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। এ বিষয়ে সাগরকন্যা কর্তৃপক্ষ কোনো দায় গ্রহণ করে না।)

বাংলাদেশ সময়: ১৬:৫৯:৩০ ● ২৭ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ