কলাপাড়ায় মাদকের ভয়াল বিস্তার, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

হোম » বিশেষ প্রতিবেদন » কলাপাড়ায় মাদকের ভয়াল বিস্তার, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা
সোমবার ● ৪ মে ২০২৬


 

র‌্যাবের হাতে ২০১৮ সালে ধরা পড়া সবচেয়ে  বড় চালান ছিল এটি। ফাইল ছবি

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় উদ্বেগজনক হারে বিস্তার ঘটেছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত মাদককারবারিদের সক্রিয়তায় যুবসমাজের একটি বড় অংশ নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের পর থেকে কক্সবাজার-কুয়াকাটা নৌরুট ব্যবহার করে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের বড় চালান কুয়াকাটা-কলাপাড়া উপকূলে প্রবেশ করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে পরিবহন, সংরক্ষণ ও খুচরা বিক্রির শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মাঝেমধ্যে বড় চালান আটক হলেও নৌপথের মূল হোতা ও আশ্রয়দাতারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

 

অভিযোগ রয়েছে, গত কয়েক বছরে উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে মাদককারবারিদের সক্রিয় নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। কোথাও শতাধিক, কোথাও তারও বেশি সদস্য নিয়ে এসব চক্র কাজ করছে বলে দাবি স্থানীয়দের। মাদকের ভয়াল ছোবলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। এরই অংশ হিসেবে উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নে এক বৃদ্ধ দম্পতি স্থানীয়দের নিয়ে নিজের সন্তানকে মাদকের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছেন।

 

কলাপাড়ায় সবচেয়ে আলোচিত মাদক চালান আটক হয় ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর। ওইদিন র‍্যাবের অভিযানে আন্ধারমানিক সেতুর টোলপ্লাজা সংলগ্ন সড়ক থেকে ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৫৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় একটি প্রাইভেট কার, বিদেশি পিস্তল, গুলি, মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম জব্দ করা হয়। এ সময় দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, মিয়ানমার থেকে সাগরপথে ইয়াবার চালান এনে কুয়াকাটা রুট ব্যবহার করা হচ্ছিল।

 

এরপরও একই রুটে মাদক পাচার বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আন্ধারমানিক নদীর মোহনার লেম্বুরচর এলাকা থেকে চার লাখ পিস ইয়াবাসহ একটি মাছ ধরার ট্রলার জব্দ করে যৌথ বাহিনী। এ সময় ১৬ জেলেকে আটক করা হয়। পরে কোস্টগার্ডের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, চালানটি কক্সবাজার থেকে আনা হয়েছিল এবং আটক জেলেদের অধিকাংশের বাড়ি সেখানেই।

 

নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল থেকে ছোট নৌকা বা ট্রলারের মাধ্যমে প্রথমে ইয়াবা বঙ্গোপসাগরে আনা হয়। পরে গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশি মাছ ধরার ট্রলারে চালান হস্তান্তর করা হয়। কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও বাঁশখালী হয়ে এসব চালান কুয়াকাটা-কলাপাড়া উপকূলে পৌঁছায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলে নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় তুলনামূলকভাবে কুয়াকাটা-কলাপাড়া উপকূলীয় রুটকে নিরাপদ মনে করে পাচারকারীরা- এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, সমুদ্রপথে মাদক শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিন শত শত মাছ ধরার ট্রলার সমুদ্রে চলাচল করায় কোন ট্রলারে মাদকের চালান রয়েছে, তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি ছোট ছোট অসংখ্য ঘাট থাকায় কোথায় মাদক খালাস হচ্ছে, সেটিও সবসময় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

 

মহিপুর থানার অফিসার ওসি মো. শামীম হাওলাদার জানান, মাদক নির্মূলে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মহিপুর থানায় মোট ৭৫টি মাদক মামলা হয়েছে।

 

কলাপাড়া থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে কলাপাড়া থানায় মাদক সংক্রান্ত আটটি মামলা হয়েছে। মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

কলাপাড়া উপজেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৮৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও ধ্বংসের পাশাপাশি অসংখ্য সেবনকারীকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযান এখনও চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৫:৪৩:১৩ ● ৫২ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ