কলাপাড়ায় বাড়ছে গ্রামীণ সহিংসতা, অস্থিরতায় শঙ্কিত জনপদ

হোম » বিশেষ প্রতিবেদন » কলাপাড়ায় বাড়ছে গ্রামীণ সহিংসতা, অস্থিরতায় শঙ্কিত জনপদ
সোমবার ● ৪ মে ২০২৬


 

কলাপাড়ায় গ্রামীণ সহিংসতায় আহতদের মধ্য থেকে কয়েকজন।

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে গ্রামীণ সহিংসতা। পারিবারিক বিরোধ, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘটছে মারধর, হামলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা। স্থানীয়দের দাবি, কার্যকর সালিশ ব্যবস্থার দুর্বলতা, সামাজিক নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গত দেড় বছরে এ ধরনের সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।

 

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৪ এপ্রিল ধুলাসার ইউনিয়নের অন্ততপাড়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে কৃষক সৈকত (২৫) গুরুতর আহত হন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কয়েকজন তাকে রড ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে তাকে কলাপাড়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় মহিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।

 

একইভাবে ১১ এপ্রিল ধানখালীর গন্ডামারি গ্রামে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ইলিয়াস প্যাদা (৪৬) নামে এক ব্যক্তিকে মারধর ও কুপিয়ে আহত করা হয়। গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবি, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে একই উঠানের কয়েকজন আত্মীয় তার ওপর হামলা চালায়।

 

গত ২৫ এপ্রিল উপজেলার খলিলপুর গ্রামে ক্যারম খেলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হন। আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্থানীয়রা বলছেন, এমন তুচ্ছ ঘটনাকেও কেন্দ্র করে দ্রুত সহিংস রূপ নিচ্ছে গ্রামীণ বিরোধ।

 

মহল্লাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবু সালাম অভিযোগ করেন, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে মারধর করা হয়েছে। কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাদের। চিকিৎসা ব্যয়ে ধারদেনা করে প্রায় অর্ধলাখ টাকার বেশি খরচ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

 

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগের মতো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ সালিশ না হওয়ায় বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করছে। পাশাপাশি কিছু বখাটে ও প্রভাবশালী তরুণ বিভিন্ন ছোটখাটো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘাত উসকে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

স্থানীয় প্রবীণদের মতে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং প্রবীণদের পরামর্শ উপেক্ষা করার প্রবণতা গ্রামীণ সমাজে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলছে।

 

কলাপাড়া হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চ মাসে শুধু গ্রামীণ সহিংসতায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা নিয়েছেন ২৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১২০ জন এবং নারী ১১৩ জন। তাদের মধ্যে ১০৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়েছে। এছাড়া জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন আরও শতাধিক ব্যক্তি।

 

কলাপাড়ার সরকারি মোজাহারউদ্দিন বিশ্বাস কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. এনামুল হক বলেন, ‘নৈতিকতার সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বর্তমান গ্রামীণ অস্থিরতার অন্যতম কারণ।’

 

মহিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী জানান, ‘পারিবারিক বিরোধের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারও বর্তমানে গ্রামীণ সংঘাত বৃদ্ধির একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

 

কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যে কোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

 

সচেতন মহলের মতে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতৃত্ব, পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কলাপাড়ার গ্রামীণ জনপদে বাড়তে থাকা এই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ সময়: ৭:১৮:৩৩ ● ৫৪ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ