আমতলী-সুবন্ধি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন

প্রথম পাতা » বরগুনা » আমতলী-সুবন্ধি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন
বুধবার ● ৫ জানুয়ারী ২০২২


আমতলী-সুবন্ধি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন

আমতলী (বরগুনা) সাগরকন্যা প্রতিনিধি॥

বরগুনার আমতলী উপজেলার চাওড়া, হলদিয়া, কুকুয়া, সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার উপর দিয়ে প্রবাহিত ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২০০ মিটার প্রস্থ চাওড়া- সুবন্ধি খালে পাড়ে বসবসরত লক্ষাধীক মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে আমতলী-সুবন্ধি নামক প্রকল্পে ৭’শ ৫১ কোটি টাকা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদন হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক  বৈঠকে এ প্রকল্প অনুমোদন হয়।  প্রকল্প অনুমোদনের খবর আমতলীতে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মাঝে স্বস্থি ফিরে এসেছে। ভুক্তভোগীরা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
জানাগেছে, ১৯৮২ সালে আমতলীর চাওড়া ও পায়রা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনের হাত থেকে আমতলী শহরকে রক্ষায় সংযোগস্থল আমতলী চৌরাস্তায় পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণ করে। কালের বিবর্তনে চাওড়া নদী মরা নদীতে পরিনত হয়। ত্রিভুজ আকৃতির ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২০০ মিটার প্রস্থ এ নদীটি উপজেলার হলদিয়া, কুকুয়া, চাওড়া, আমতলী সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভার ২৫টি গ্রামের উপর দিয়ে প্রবাহিত। নদীর ভৌগলিক অবস্থানের কারনে সুবন্ধি অংশে বাঁশবুনিয়া নদী, ঘুঘুমারী অংশে টিয়াখালী ও আমতলীর অংশে পায়রা নদীর সাথে সংযোগ রয়েছে। প্রাকৃতিক জলোচ্ছাস ও লবনাক্ততার হাত থেকে মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় ২০০৯ সালে বাঁশবুনিয়া নদীর একাংশ সুবন্ধি নামক স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু এতে পানি প্রবাহ বিঘিœত হয়। ২০১৫ সালে চাওড়া ও সুবন্ধি নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে সুবন্ধি বাধে দু’ব্যান্ডের স্লুইজ নির্মাণ করা হয়। এদিকে ১৯৬৭ সালে জুলেখা খালে পাঁচ কপাট ও উত্তর টিয়াখালী খালে পাঁচ কপাট এবং ঘুঘুমারিতে এক কপাটের স্লুইজ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সুবন্ধির তিনটি জলকপাট থেকে পানি নিস্কাসনের কারনে নদীর ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত পানি’র স্বাভাবিক প্রবাহ রয়েছে। কিন্তু উত্তর টিয়াখালী ও ঘুঘুমারি খালের জল কপাট এবং জুলেখার খালের লক্ষী নামক স্থানে তিনটি বাঁধ, উত্তর টিয়াখালী স্লুইজের আউরা বৈরাগী নামক স্থানে বাঁধসহ খালের বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করে পানি প্রবাহ বন্ধ করে রেখেছে প্রভাবশালীরা। অপরদিকে সুবন্ধি নদী সংলগ্ন নাচনাপাড়া ও আমতলী খালসহ ১০টি খাল প্রভাবশালীরা অবৈধ ভাবে বাঁধ  দিয়ে মাছ চাষ এবং খাল দখল করে স্থায়ী বাড়ী ঘর নির্মাণ করছেন। এতে নদীর পশ্চিম, দক্ষিণ ও পুর্ব দিকের পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে ২০ কিলোমিটারের কচুরীপানা আটকে জনদুভোর্গ চরম আকার ধারন করেছে। নদীর দু’পাড়ের মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে না। কচুরীপানার কারনে পানি নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে পরিবেশ দুষিত হয়ে মারাত্ত্বক আকার ধারন করেছে। ওই খালের পানি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পরেছে। এমনকি গবাদি পশুও ওই পানি ব্যবহার করছে না। এ খালের দু’পাড়ের প্রায় লক্ষাধীক মানুষের জনদুর্ভোগে পরিনত হয়েছে। ফলে খালের পানি প্রবাহ নিশ্চিতকরন ও অবৈধ দখল খাল মুক্তোর দাবীতে বিভিন্ন সংগঠন, গণমাধ্যম কর্মী ও স্থানীয়রা আন্দোলন করে আসছে। লাখো মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে চাওড়া নদীর পানি নিষ্কাশন ও কচুরীপানা অপসারনে ২০১৬ সালে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ৭’শ ৫১ কোটি টাকার আমতলী-সুবন্ধি মেগা প্রকল্প অনুমোদনের জন্য কারিগরি প্রতিবেদন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান কার্যালয় জমা দেয়। প্রকল্প এলাকা দেখতে কয়েক দফায় পরিদর্শনে আসেন সংশ্লিষ্ট দফতরের উর্ধতন কর্মকর্তারা। এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৪৩/১ পোল্ডারের লোচা খালে ৫ ব্যান্ডের স্লুইজ, সোনাগজা ২ ব্যান্ডের স্লুইজ, সেনের হাট ২ ব্যান্ডের  স্লুইজ ও পূর্বচিলা ২ ব্যান্ডের স্লুইজ নির্মাণ, ঘুঘুমারি ২ ব্যান্ডের স্লুইজ, আমড়াগাছিয়া গুদির খালে এক ব্যান্ডের স্লুইজ, ছুরিকাটা মহাসড়কে কালভার্ট, চন্দ্রাপাতাকাটা ও কাউনিয়া বাঁধে ২ টি কালভার্ট, পশ্চিম ঘটখালী ও কৃষ্ণনগর ২ টি আইটলেট ও ছোট সোনাউডা খালের আউটলেট নির্মাণ। এছাড়াও ৬১ কিলোমিটার খাল খনন ও ১৫ কিলোমিটার খালের কচুরীপানা উত্তোলন রয়েছে এ প্রকল্পে। এই পোল্ডারের আওতায় পশ্চিম ঘটখালী নামক স্থানের পায়রা নদীর তীরে এক কিলোমিটার প্রতিরক্ষামুলক (ব্লক) নির্মাণ এবং আমতলী পৌরসভার ২৫০ মিটার পায়রা নদীর তীরে ব্লক স্থাপন। ৪৪/বি পোল্ডারের পায়রা নদীর পশুরবুনিয়া নামক স্থানে সাড়ে তিন কিলোমিটার প্রতিরক্ষামুলক ব্লক স্থাপন ও কচুপাত্রা দোনের বগী খালের গোড়ায় ৫ ব্যান্ডের স্লুইজ নির্মাণ করা হবে। কারিগরি প্রতিবেদন জমা দেয়ার পাঁচ বছর পরে আমতলী-সুবন্ধি প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদন হয়। এতে লক্ষাধীক মানুষের দূর্ভোগ লাঘব হবে বলে আশা ভুক্তভোগীদের। একনেকে প্রকল্প অনুমোদন হওয়া খবর আমতলীতে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্থি ফিরে এসেছে। তারা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।
দক্ষিণ রাওঘা গ্রামের মোঃ বশির উদ্দিন বাদল মৃধা বলেন, অবশেষে আমাদের দুর্ভোগ লাগবে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন।
চাওড়া কাউনিয়া গ্রামের জিয়া উদ্দিন জুয়েল ও আউয়াল বলেন, আল্লাহ অল্প দিনের মধ্যেই দুর্ভোগ লাঘব করবে। গত ১২ বছর ধরে খালের পচা পানির দুর্গন্ধ উপভোগ করে আসছি। এখন খাল থেকে কচুরীপানা উত্তোলন ও  খাল খনন করলে এই দুর্ভোগ আর থাকবে না। লাখো মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ জানান তারা।
আমতলী উপজেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ভুয়াসী প্রশংসা করে বলেন, আওয়ামীলীগ সরকার উন্নয়নের সরকার। স্বাধীনোত্তর ৭’শ৫১ কোটি টাকার এতো বড় প্রকল্প বরগুনা জেলার আর হয়নি। আমতলী-তালতলী উপজেলা হলো প্রধানমন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী অঞ্চল। তার অঞ্চলে উন্নয়ন তো হবেই। তিনি আরো বলেন, দক্ষিণাঞ্চল উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছে। তা থেকে আমতলীও বিমুখ হয়নি।
পরিবেশবীদ  বে-সরকারী সংস্থা এনএসএস’র নির্বাহী সম্পাদক অ্যাড, শাহাবুদ্দিন পান্না বলেন, সুবন্ধি বাধের কারনে ওই এলাকার প্রায়  লক্ষাধীক মানুষ চরম দুর্ভোগে ছিল। বিভিন্ন বে-সরকারী সংস্থা,গণমাধ্যম ও স্থানীয়দের আন্দোলনের ফলস আমতলী-সুবন্ধি প্রকল্প। সরকারের এ উদ্যোগের ফলে তিনটি ইউনিয়ন ও  পৌরসভার মানুষ ব্যপকভাবে উপকৃত হবেন।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কাইছার আলম বলেন,  আমতলী-সুবন্ধি প্রকল্পে ৭’শ ৫১ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। ওই প্রকল্পে ৬১ কিলোমিটার খাল খনন, পায়রা নদীর ভাঙ্গন রোধে ৫ কিলোমিটার ব্লক নির্মাণ ও পানি প্রবাহ নিশ্চিত ও কৃষকদের জমি চাষাবাদ সুগম করতে ১৮ টি রেগুলেটর নির্মাণ করা হবে। আশা করি অল্প দিনের মধ্যেই এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।

এমএইচকে/এমআর

বাংলাদেশ সময়: ২২:৪৯:০১ ● ১২৩ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ