বেনাপোল-পেট্রাপোল শূন্যরেখায় এবারেও অনুচ্চারিত ছিল একুশ

হোম পেজ » মতামত » বেনাপোল-পেট্রাপোল শূন্যরেখায় এবারেও অনুচ্চারিত ছিল একুশ
সোমবার ● ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


 

বেনাপোল-পেট্রাপোল শূন্যরেখায় এবারেও অনুচ্চারিত ছিল একুশ

দেবুল কুমার দাস

একুশে ফেব্রুয়ারি পেরিয়ে গেছে দু’দিন। জাতীয় ক্যালেন্ডারে দিনটি শেষ হলেও ভাষার মাসে তার অনুরণন এত দ্রুত স্তিমিত হয় না। একুশের প্রথম প্রহরে যখন দেশের সর্বত্র শহীদ মিনার পুষ্পার্ঘ্যে ভরে উঠেছিল, যখন কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, তখনও বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত-এর শূন্যরেখা ছিল নীরব- অনুষ্ঠানহীন, জনশূন্য, অনুচ্চারিত।

 

একসময় এই শূন্যরেখাই হয়ে উঠেছিল দুই বাংলার আবেগের মিলনমঞ্চ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সীমান্তের মাঝখানে গড়ে উঠত অস্থায়ী শহীদ মিনার। কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ একই ভাষায় কথা বলতেন, একই গান গাইতেন, একই শহীদ বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতেন। রাষ্ট্রের সীমানা সেদিন প্রতীকীভাবে ম্লান হয়ে যেত; মুখ্য হয়ে উঠত ভাষা, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়।

 

এবারও সেই আয়োজন হলো না। যৌথ উদ্যোগের জটিলতা, নিরাপত্তা-সংকট ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা সামনে এসেছে। সীমান্ত মানেই বিধিনিষেধ- এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভাষার ইতিহাসে যে দিনটি বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রতীক হয়ে আছে, সেই দিনটিতে সীমান্তের এই নীরবতা আমাদের কী বার্তা দেয়?

 

শূন্যরেখার অনুপস্থিত আয়োজন কেবল একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচির স্থগিত হওয়া নয়; এটি দুই বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের আত্মীয়তাবোধের সাময়িক অবসানও বটে। দেশভাগের পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর জন্য একুশ ছিল বছরে একদিনের অবাধ আবেগের সুযোগ- চোখে চোখ রেখে কথা বলা, একসঙ্গে দাঁড়িয়ে শহীদদের স্মরণ করা। সেই মানবিক দৃশ্যগুলো আজ স্মৃতির ভাঁজে সীমাবদ্ধ।

 

২০০২ সাল থেকে যে মিলনমেলার সূচনা হয়েছিল, তা নিছক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; এটি ছিল ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংহতির এক দৃশ্যমান প্রতীক। সাম্প্রতিক বছরগুলোর রাজনৈতিক টানাপোড়েনে সে ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে। তবু ভাষার চেতনা রাজনৈতিক সময়ের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী- এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

 

আজ ২৩ ফেব্রুয়ারির দূরত্ব থেকে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, শূন্যরেখার নীরবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একুশ কেবল রাষ্ট্রীয় পালন নয়; এটি সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা। কাঁটাতার থাকবেই, কিন্তু ভাষার স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রশ্নটি আমাদের সামষ্টিক বিবেচনার বিষয়।

 

এবারেও শূন্যরেখায় একুশ উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু উচ্চারণহীনতার মধ্যেও যে অভিন্ন অনুভব, তা নিশ্চুপ নয়। ভবিষ্যতের কোনো এক প্রভাতে যদি প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা ও সমন্বয়ে সেই মিলনমেলা ফিরে আসে, তবে তা হবে কেবল একটি অনুষ্ঠান পুনরুজ্জীবন নয়; বরং ভাষার নামে নির্মিত মানবিক সেতুর পুনঃস্থাপন।

বাংলাদেশ সময়: ১২:২১:৪২ ● ১১৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ