
আল-আমিন হোসাইন, সাগরকন্যা প্রতিবেদক, নাজিরপুর (পিরোজপুর)
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বেলুয়া নদীর বৈঠাকাটা ভাসমান হাটে হাটের দিনে কোটি টাকার লেনদেন হয়। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে নদীর বুকে গড়ে ওঠা এ হাট দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শতাধিক নৌকা ভিড়তে থাকে নদীর ঘাটে। নৌকায় আসে শাকসবজি, মাছ, হাঁস-মুরগি, চাল-ডাল থেকে শুরু করে চা-পিঠা পর্যন্ত। মাঝির বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, ট্রলারের গর্জন আর ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো নদী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হয় বেচাকেনা। বর্ষায় সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত, আর শীতে বেলা ১০টা পর্যন্ত চলে লেনদেন। পিরোজপুর সদর থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার ও নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে এ হাটে পৌঁছাতে হয় নৌপথে। কারণ এ অঞ্চল মূলত বিলাঞ্চল, যেখানে সড়ক যোগাযোগ এখনো সীমিত।
ভাসমান নৌকায় পাওয়া যায় স্থানীয় চাহিদার প্রায় সব পণ্য। পিরোজপুর ছাড়াও বরিশাল, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর ও ঝালকাঠি থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন।
খুলনার ব্যবসায়ী আব্দুল হক সাগরকন্যাকে বলেন, এখানকার চারা ও সবজির মান ভালো। এখান থেকে পাইকারি কিনে খুলনা, বাগেরহাট ও মোরেলগঞ্জে বিক্রি করি। আগে ছোট নৌকা ছিল, এখন বড় ট্রলার আছে। ক্রেতার অভাব হয় না।
বিশারকান্দির ব্যবসায়ী এনায়েত বাহাদুর জানান, ৪০ বছর ধরে তিনি এই হাটের সঙ্গে যুক্ত। এখান থেকে কেনা পণ্য ভোলা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিক্রি করেন।
সোনাপুর গ্রামের কৃষক আজাদ শেখ বলেন, বাপের সঙ্গে আগে হাটে আসতাম, এখন নিজেই আসি। সরকার যদি আমাদের দেখত, তাহলে এত অবহেলায় থাকতে হতো না।
লঞ্চে করে ঢাকায় পণ্য পাঠাতেন ব্যবসায়ী লাবু মোল্লা। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর যাত্রী কমে লঞ্চ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তাদের ব্যয় বেড়েছে। বৈঠাকাটা থেকে নাজিরপুর পর্যন্ত রাস্তা ভাঙা থাকায় গাড়িতে পণ্য পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হাসানত ডালিম সাগরকন্যাকে বলেন, বৈঠাকাটা ভাসমান হাটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। কৃষকরা সরাসরি ফসল বিক্রি করেন, ফলে ন্যায্য দাম পান। হাটের দিনে কোটি টাকার লেনদেন হয় এখানে।
নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা বলেন, বৈঠাকাটা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান বাজার। এর উন্নয়নে বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
নদীভিত্তিক এই হাট শুধু অর্থনীতির নয়, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবিও বহন করে।