কলাপাড়ায় খাল-রাস্তা ছাড়াই প্রায় তিন কোটি টাকার সেতু! ঠিকাদারের দাবি ‘খাল ভরাট হয়ে গেছে’

হোম » লিড নিউজ » কলাপাড়ায় খাল-রাস্তা ছাড়াই প্রায় তিন কোটি টাকার সেতু! ঠিকাদারের দাবি ‘খাল ভরাট হয়ে গেছে’
শুক্রবার ● ৩০ অক্টোবর ২০২৬


 

খালের অস্তিত্ব না থাকায় ভেকু দিয়ে এভাবে খালের নকশা তৈরির মতো কাজ করতে দেখা যায়।

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

 

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধূলাসার ইউনিয়নের গঙ্গামতি তেত্রিশকানি এলাকায় খাল ও সংযোগ সড়ক ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ের একটি পিসি গার্ডার সেতু। আশপাশে খালের অস্তিত্ব নেই, নেই সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কও। এমন জায়গায় সেতু নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের আশঙ্কা, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হলেও সেতুটি শেষ পর্যন্ত কোনো কাজে আসবে না। তবে ঠিকাদারের দাবি, সেতুটি খালের ওপরই নির্মাণ করা হচ্ছে। খালটি ভরাট হয়ে গেছে।

 

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ধূলাসার ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের গঙ্গামতি তেত্রিশকানি এলাকায় বেড়িবাঁধের বাইরে সেতুটির নির্মাণকাজ চলছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুনে নির্মাণকাজ শুরু হয়। চলতি বছরের শেষ দিকে কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

 

স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গিয়াস উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি সেতুটির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কাজটির দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জসিম উদ্দিন খান। তবে ঠিকাদার পরিবর্তন ও কাজ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির আশপাশে কয়েকটি বসতঘর রয়েছে। তবে সেখানে দৃশ্যমান কোনো খাল কিংবা সেতুর সঙ্গে সংযুক্ত চলাচলের রাস্তা নেই। সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় নির্মাণকাজ শেষ হলে এটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

 

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় উন্নয়ন হোক, এটা আমরা চাই। কিন্তু যেখানে খাল নেই, রাস্তা নেই, সেখানে এত টাকা খরচ করে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কী? সেতু নির্মাণের আগে মানুষের চলাচলের ব্যবস্থা ও জায়গার বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করা উচিত ছিল।’

 

স্থানীয় বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, ‘সেতু হলে মানুষের উপকার হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে সেতুর দুই পাশে যাওয়ার মতো রাস্তা নেই। খালেরও অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না। তাহলে এই সেতু দিয়ে মানুষ চলাচল করবে কীভাবে? প্রকল্পের টাকা খরচ হলেই তো উন্নয়ন হয় না, মানুষের কাজে আসতে হবে। আমাদের জন্য সেতুর চেয়ে একটি সাইক্লোন শেল্টার বেশি জরুরি।’

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘সেতুর নির্মাণকাজের কারণে আশপাশের কয়েকটি পরিবারের ভোগান্তি হচ্ছে। কেউ কেউ ঘরবাড়ি নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসে সরেজমিনে দেখুক। জনগণের টাকায় এমন কোনো কাজ হওয়া উচিত নয়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষের কোনো উপকারে আসবে না।’

 

স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দিন আগে খালের অস্তিত্ব না থাকায় ভেকু দিয়ে খালের নকশা তৈরির মতো কাজ করতে দেখা গেছে। তাঁদের প্রশ্ন, প্রকল্প গ্রহণের আগে জায়গাটি সরেজমিনে পরিদর্শন, খালের অস্তিত্ব যাচাই ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না।

 

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সেতুটি পর্যটক এবং স্থানীয়দের চলাচলে উপকারে আসবে। তবে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, নকশা, সম্ভাব্য উপকারভোগী, খালের অস্তিত্ব এবং পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

 

অন্যদিকে, নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন খান বলেন, ‘পিসি গার্ডার ব্রিজটি খালের ওপরেই হচ্ছে। হয়তো খালটি এখন ভরাট হয়ে গেছে। প্রকল্পের ব্যয় প্রায় তিন কোটি টাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি বিগত সরকারের আমলের কাজ। আমরা কার্যাদেশ পাওয়ার পর ২০২৫ সালের জুনের দিকে কাজটি শুরু করেছি।’

 

সেতুটি নির্মাণের স্থান কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছে, প্রকল্প অনুমোদনের আগে খাল ও সংযোগ সড়কের অস্তিত্ব যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা জানতে চান স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ ও সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:২৪:৪৫ ● ৩৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ