
কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী থেকে
পায়রা সেতুর ওজন স্কেলে অতিরিক্ত পণ্য বহনের জরিমানা এড়াতে প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরে বিকল্প পথে চলাচল করছে পণ্যবাহী ভারী ট্রাক। এতে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে বলে দাবি করেছে সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান বেস্ট ইস্টার্ন গ্রুপ। অন্যদিকে, বিকল্প পথে ভারী যানবাহনের চাপ বাড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পটুয়াখালী-মির্জাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক। ঝুঁকিতে পড়েছে এ সড়কের পাঁচটি স্টিলের বেইলি ব্রিজ। ফলে সরকার একদিকে সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে সড়ক ও সেতু রক্ষণাবেক্ষণে বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পটুয়াখালী-ঢাকা মহাসড়কের লেবুখালীতে পায়রা নদীর ওপর নির্মিত পায়রা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেতুটি চালুর ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে পটুয়াখালী ও কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ সহজ হয়েছে। তবে সেতুর ওজন স্কেলে অতিরিক্ত পণ্য বহনের কারণে জরিমানার মুখে পড়তে হয়, এমন অভিযোগে অনেক ট্রাকচালক মহাসড়ক এড়িয়ে বিকল্প পথে চলাচল করছেন। তাঁরা বরিশালের বাকেরগঞ্জ থেকে মির্জাগঞ্জের পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাট হয়ে পটুয়াখালীতে প্রবেশ করছেন। এতে সেতুর টোল আদায়ে প্রভাব পড়ার পাশাপাশি বিকল্প সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি এক দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাটে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ওই সময়ে ১৯১টি ভারী ট্রাক ফেরি পার হয়েছে। ফেরিঘাটের কর্মীদের দাবি, পায়রা সেতুর টোল আদায়ব্যবস্থা ডিজিটাল করার আগে এ ঘাট দিয়ে প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১২টি ট্রাক পারাপার হতো। বর্তমানে ট্রাক পারাপারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ফেরিঘাটের কর্মীরা জানান, পায়রা সেতুর ওজন স্কেলে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত পণ্য বহন করলে জরিমানা দিতে হয়। এ জরিমানা এড়াতেই অনেক ট্রাকচালক বিকল্প সড়ক ব্যবহার করছেন বলে তাঁদের ধারণা। এতে পায়রা সেতু দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল ও টোল আদায় কমছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বিকল্প পথে চলাচলকারী এক ট্রাকচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম, বিভিন্ন সেতুর টোল ও অন্যান্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে খরচ পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। পায়রা সেতুতে অতিরিক্ত ওজনের জন্য জরিমানা দিতে হলে লোকসান আরও বাড়ে। তাই বিকল্প সড়ক ব্যবহার করছি।’
পায়রা সেতুতে টোল আদায়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান বেস্ট ইস্টার্ন গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার রাশেদুল হক খান বলেন, ‘পায়রা সেতু ব্যবহার না করে ভারী ট্রাকগুলো বিকল্প পথে ঘুরে পটুয়াখালীতে প্রবেশ করায় সেতুর টোল আদায়ে প্রভাব পড়ছে। এতে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় কম হলে বছরে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
পটুয়াখালী সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক হাজার ১১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পায়রা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয় এক হাজার ১৭০ মিটার দীর্ঘ ও ১৯ দশমিক ৭৬ মিটার প্রস্থের পায়রা সেতু। ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুটির উদ্বোধন করেন। পদ্মা সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকার সঙ্গে কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে পায়রা সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সেতুটিতে শুরু থেকেই টোল আদায় চালু রয়েছে। তবে গত বছরের আগস্টে টোল আদায়ব্যবস্থা পুরোপুরি ডিজিটাল করা হয়। এরপর ট্রাকের ওজন স্কেলে পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সেতুতে যানবাহনের ধরন অনুযায়ী পণ্যবাহী ট্রাকের ওজনসীমা নির্ধারিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত প্রথম এক টনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতি টনের জন্য ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। অতিরিক্ত পণ্য বহনের কারণে জরিমানার মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকেই কিছু ট্রাকচালক বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে বিকল্প পথে ভারী যানবাহনের চলাচল বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে পটুয়াখালী-মির্জাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের ওপর। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারী ট্রাকের অব্যাহত চলাচলে সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি এ সড়কের পাঁচটি স্টিলের বেইলি ব্রিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব সেতু ও সড়ক ভারী যানবাহনের চাপ সহ্য করতে না পারলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সড়ক মেরামত ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
পটুয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামিল আকতার লিমন বলেন, ‘ভারী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) নির্মাণাধীন পায়রাকুঞ্জ সেতুতে ওয়েট স্কেল স্থাপন করা হলে এ প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব। সাময়িকভাবে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মির্জাগঞ্জ সড়কের দুই পাশে প্রতিবন্ধকতামূলক বার স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও ভারী যানবাহনের চলাচল বন্ধ হয়নি। রাতের আঁধারে সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। নিয়মিতভাবে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হলে এ প্রবণতা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, পায়রা সেতুর ওজন স্কেল এড়িয়ে বিকল্প পথে ভারী ট্রাক চলাচল বন্ধ করতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এ জন্য বিকল্প সড়কে ভারী যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং পায়রাকুঞ্জ সেতুতে ওয়েট স্কেল স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পায়রা সেতুর টোল আদায় কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে রাজস্ব ঘাটতির সুনির্দিষ্ট হিসাব নিরূপণ করাও জরুরি।
রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামো রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বিকল্প সড়ক ও বেইলি ব্রিজগুলোর ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। এতে একদিকে সরকারি রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি, অন্যদিকে সড়ক অবকাঠামো মেরামতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।