কলাপাড়ায় শিশু রাইয়ান হত্যার আগে সারা রাত ইয়াবা সেবন, আদালতে আল-আমিনের স্বীকারোক্তি

হোম » পটুয়াখালী » কলাপাড়ায় শিশু রাইয়ান হত্যার আগে সারা রাত ইয়াবা সেবন, আদালতে আল-আমিনের স্বীকারোক্তি
বৃহস্পতিবার ● ২৯ অক্টোবর ২০২৬


কলাপাড়ায় শিশু রাইয়ান হত্যার আগে সারা রাত ইয়াবা সেবন, আদালতে আল-আমিনের স্বীকারোক্তিমেজবাহউদ্দিন মাননু

 

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১০ মাসের দুগ্ধপোষ্য শিশু রাইয়ানকে হত্যার আগে সারা রাত জেগে ইয়াবা সেবন করেন তার খালু আল-আমিন। আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা ও মরদেহ গুমের চেষ্টার বিবরণ দিয়েছেন তিনি।

 

জবানবন্দি অনুযায়ী, ঘটনার দিন ভোরে আজানের সময় ঘর থেকে বের হয়ে শ্যালিকা রুমানার বাড়িতে যান আল-আমিন। পেছন দিক থেকে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখেন, রুমানা ঘরের পিঁড়ি লেপার কাজ করছেন এবং ১০ মাসের শিশু রাইয়ান তার বাবার কাছে ঘুমিয়ে আছে। এরপর এক হাতে শিশুটিকে কোলে তুলে অন্য হাতে মুখ চেপে ধরে বুকের সঙ্গে চেপে দ্রুত নিজের বাড়ির দিকে চলে যান তিনি।

 

বাড়ির সামনে গ্রামের হেলালের একটি পরিত্যক্ত ঘরে শিশুটিকে রেখে দেখেন, সে নিথর। নড়াচড়া না করায় রাইয়ান মারা গেছে বলে ধারণা করেন আল-আমিন। পরে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার ওই ঘরে ঢোকেন। কোমর থেকে কাপড়ের ব্যাগ বের করে শিশুটির মরদেহ উল্টোভাবে ব্যাগে ঢুকিয়ে ওই ব্যাগের মুখ বেঁধে ফেলেন। এরপর ব্যাগটি হেলালের ঘরের টিনের চালের ওপর রাখেন।

 

পরে হেলালের পুকুরে নেমে গামছা দিয়ে নিজেকে ভিজিয়ে নেন আল-আমিন, যাতে কেউ দেখলে মনে করে তিনি মাছ ধরে ফিরেছেন। এরপর মরদেহভর্তি ব্যাগ নিয়ে নিজের বাড়ির পেছনে যান। আশপাশে কাউকে না দেখে ব্যাগটি খালে ফেলে দেন। কিন্তু ব্যাগটি ডুবে না যাওয়ায় আবার খালে নেমে কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকে উঠে টিউবওয়েলে হাত-পা ধুয়ে বাড়িতে গিয়ে পান ও সিগারেট খান।

 

আল-আমিনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এরপর অন্যদের মতো তিনিও রাইয়ান নিখোঁজ হওয়ার খবর পান। বিষয়টি জানার পর নিজের ছেলে ও ছেলের বউকে শিশুটিকে খুঁজতে ওই বাড়িতে যেতে বলেন। নিজেও খোঁজাখুঁজিতে অংশ নেন এবং শ্যালিকা রুমানাকে পুকুরে খুঁজতে বলেন।

 

জবানবন্দিতে আল-আমিন দাবি করেন, তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম পাঁচ বছর ধরে বিদেশে থাকতেন। মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হলেও তিনি বাড়িতে আসতেন না। এ বিরোধ মেটাতে অনেকের কাছে গিয়েও সমাধান পাননি তিনি। সর্বশেষ শ্যালিকা রুমানার কাছে গেলে তিনি উল্টো জুতা দিয়ে মারতে উদ্যত হন এবং দুইবার আঘাত করেন বলে দাবি করেন আল-আমিন। আবার ওই বাড়িতে গেলে জুতা দিয়ে মারার হুমকিও দেওয়া হয় বলে তার ভাষ্য।

 

এরপর রুমানার ওপর ক্ষোভ থেকে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করেন বলে স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করেন আল-আমিন। ঘটনার আগে কয়েকবার শিশু রাইয়ানকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে শিশুটিকে নিয়ে হত্যা করে খালে ফেলে রাখেন বলে জবানবন্দিতে স্বীকার করেন তিনি।

 

চার দিনের পুলিশি রিমান্ড শেষে আল-আমিন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাপাড়া থানার উপপরিদর্শক মো. ফোরকান মিয়া জানান, আদালতের নির্দেশে ১৮ অক্টোবর প্রধান আসামি আল-আমিনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চার দিন পর হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন তিনি। ২১ অক্টোবর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

 

এদিকে শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তার মা রুমানা বেগম যথাযথ বিচার দাবি করছেন। তার অভিযোগ, রাইয়ানের ঘাড় মটকে এবং হাত-পা ভেঙে হত্যার পর কাপড়ের বাজারের ব্যাগে ভরে কচুরিপানার নিচে খালে ফেলে দেওয়া হয়। তার দাবি, ভগ্নিপতি ইয়াবাসেবী আল-আমিনই এ নৃশংসতা চালিয়েছেন। হত্যার দিন সকালে নিজের বাড়িতে বেলা ১১টা পর্যন্ত নিখোঁজ রাইয়ানকে খোঁজার ভান করেন আল-আমিন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

কারাগারে থাকা আল-আমিনের সহযোগী ও কথিত গডফাদারদের হুমকির কারণে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন রুমানা। তার অপর দুই সন্তান ১৪ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রী তানহা ও আট বছর বয়সী তাহিরা এবং কর্মজীবী স্বামী রাসেল খানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি।

 

রুমানা জানান, ১৫ অক্টোবর পুলিশ আল-আমিনকে আটক করার রাতে তার কথিত গডফাদারখ্যাত এক ব্যক্তি কয়েকজন ক্যাডার নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেন। ওই ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য, যার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে রুমানার দাবি। আল-আমিনকে ছাড়িয়ে না আনলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর থেকে পরিবারটি চরম ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানান রুমানা।

 

রুমানার অভিযোগ, তার বোনের স্বামী হলেও আল-আমিন মাদকসেবী ও মাদককারবারি। তিনি পেশাদার চোর বলেও অভিযোগ করেন রুমানা। তার দাবি, গুটাবাছা গ্রামের তিনটি টিউবওয়েলের বডি চুরি করে বিক্রি করেছেন আল-আমিন। মানুষের পানির পাম্পও চুরি করেছেন। ৫ আগস্টের পর বিএনপির পরিচয়ে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ করেন রুমানা। এর আগে আল-আমিন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালাতেন।

 

রুমানার দাবি, তার বোন ফিরোজার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে বিরোধের কারণে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই আল-আমিন এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিশোধ নিয়েছেন। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

 

নিহত রাইয়ানের দাদি হালিমা বেগম জানান, তার তিন ছেলের মধ্যে দুজনের বিয়ে হয়েছে। তাদের কারও ছেলে সন্তান নেই। নাতি রাইয়ানকে হারিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। হালিমা বলেন, ‘কোনো মানুষের এমন কাজ করার কথা না। ও (আল-আমিন) মানুষ না, পশু। ওর এখন ফাঁসি চাই। কারণ, আল-আমিন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে গেলে পরিবারের অন্যদের ওপরও এমন সহিংসতা চালাতে পারে।’

 

এর আগে নিখোঁজের ৫৩ ঘণ্টা পর ১৭ অক্টোবর বাড়ির পাশের খাল থেকে ১০ মাসের শিশু রাইয়ানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে স্থানীয়রা প্রথমে দুর্গন্ধ পান। পরে কচুরিপানার মধ্যে একটি ব্যাগ দেখতে পেয়ে থানায় খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গুটাবাছা গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। শিশুটির মর্মান্তিক পরিণতিতে পরিবার ও এলাকাবাসী ঘাতকের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।

 

কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দ্রুত মূল আসামিকে আটক করি। নিখোঁজের ৫৩ ঘণ্টা পর শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এখন পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ওই পরিবারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক থানায় জানাতে বলা হয়েছে।’

বাংলাদেশ সময়: ১৮:৪১:৩৬ ● ৩৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ