বরিশালে নদীভাঙনের থাবা, পাঁচ বছরে পাঁচবার ঘর সরিয়েছেন জয় হাজরা

হোম » বিশেষ প্রতিবেদন » বরিশালে নদীভাঙনের থাবা, পাঁচ বছরে পাঁচবার ঘর সরিয়েছেন জয় হাজরা
মঙ্গলবার ● ১৩ অক্টোবর ২০২৬


 

বরিশালে নদীভাঙনের থাবা, পাঁচ বছরে পাঁচবার ঘর সরিয়েছেন জয় হাজরা

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরিশাল

 

বাপ-দাদার ভিটেমাটি বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে পাঁচ বছরে পাঁচবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামের বাসিন্দা জয় হাজরার পরিবারকে। প্রতিবার নতুন করে ঘর বেঁধে সংসার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নদীর ভাঙন থামেনি। এবার যে জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন, সেটিও কত দিন টিকবে, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি।

 

জয় হাজরার মতো বরিশালের নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষের জীবনেও এখন অনিশ্চয়তা। কারও বসতঘর চোখের সামনে নদীতে বিলীন হচ্ছে, কারও ফসলি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ হারাচ্ছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জীবিকার শেষ সম্বল। বারবার ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নতুন করে ঘর বাঁধার জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ তাকিয়ে আছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

 

বরিশালের মেঘনা, কালাবদর, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কীর্তনখোলা, পাণ্ডব ও আড়িয়াল খাঁসহ বিভিন্ন নদীতে অব্যাহত ভাঙনে বদলে যাচ্ছে জনপদের চিত্র। একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, বাজার, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। কোথাও বসতঘর সরিয়ে নেওয়ার আগেই তলিয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা চলে এসেছে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে।

 

১০ দিনে ৮০ বসতঘর বিলীন মেহেন্দিগঞ্জে

 

বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় নদীভাঙনের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মেঘনা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীতীরবর্তী এ উপজেলার চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়নে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৮০টি বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সময়ে বাজারের প্রায় ৪০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও নদীতে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

 

এ ছাড়া উপজেলার গোবিন্দপুর, চর মিঠুয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া, আদর্শ নগর, আন্দারমানিক, জাঙ্গালিয়া ও দক্ষিণ উলানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি জীবিকা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে নদীতীরবর্তী মানুষের।

 

বসতভিটা হারিয়ে দিশাহারা বাবুগঞ্জের মানুষ

 

বাবুগঞ্জ উপজেলায়ও সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে বিপর্যস্ত জনজীবন। এসব নদীর ভাঙনে সড়ক, বেড়িবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শতাধিক বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

 

উপজেলার মীরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় ভাঙনের কারণে একাধিক গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও বসতঘর সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছেন বাসিন্দারা। ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামের নদীভাঙন বরিশাল বিমানবন্দরের দক্ষিণ পাশের নিরাপত্তাপ্রাচীরের প্রায় ৬০০ মিটারের কাছাকাছি চলে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

 

পাঁচ বছরে পাঁচবার ঘর সরিয়েছেন জয় হাজরা

 

বানারীপাড়ার ইলুহার গ্রামের জয় হাজরার পরিবারের অভিজ্ঞতা নদীভাঙনের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের চিত্র তুলে ধরে। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে তাঁদের বাপ-দাদার সব সম্পত্তি বিলীন হয়ে গেছে। টিকে থাকার তাগিদে গত পাঁচ বছরে পাঁচবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে।

 

জয় হাজরা বলেন, ‘সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে বাপ-দাদার সব সম্পত্তি চলে গেছে। গত পাঁচ বছরে আমাদের পরিবার পাঁচবার বসতবাড়ি সরিয়েছে। যে পরিস্থিতি, তাতে হয়তো এখন যেখানে আছি, সেটি এ বছর টিকে গেলেও আগামী বছর আর টিকবে কি না, জানি না।’

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বানারীপাড়ায় নদীভাঙনের তীব্রতা আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। বসতভিটার পাশাপাশি কৃষিজমি ও জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে অনেক পরিবার সংকটে পড়েছে।

 

বরিশাল সদরেও ভাঙনে হারাচ্ছে বসতি

 

বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়ীয়া, চরমোনাই ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। গত দেড় দশকে চরবাড়ীয়া ইউনিয়নের লামচরী গ্রামের কয়েক শ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। একসময় যেখানে মানুষের বসতি ছিল, সেখানে এখন নদীর পানি।

 

শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা করিম হাওলাদার বলেন, ‘ফসলি জমি ও ভিটেমাটি-সবই নদীর ভাঙনে চলে গেছে। ভাঙন শুরু হলে সহজে থামতে চায় না। আমাদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ।’

 

রাতের আঁধারে হারিয়ে যায় শেষ আশ্রয়

 

নদীভাঙন কখনো এত দ্রুত ঘটে যে, বাসিন্দারা ঘরের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পান না। বিশেষ করে রাতে ভাঙন শুরু হলে বিপদের আশঙ্কা বেড়ে যায়। ঘুমন্ত মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুমকির মুখে পড়ে তাঁদের জীবন ও বসতভিটা।

 

মুলাদী উপজেলার কৃষক আবুল ফজল নিজের বসতভিটা চোখের সামনে নদীতে বিলীন হতে দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য, ভাঙন এতটাই আকস্মিক ছিল যে, আগে থেকে কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পাননি।

 

আবুল ফজল বলেন, ‘চোখের সামনে নিজের বসতভিটা ভাঙনে চলে গেছে। ভোররাতে যদি টের না পেতাম, তাহলে হয়তো আমরাও আর বেঁচে ফিরতে পারতাম না। রাতে হঠাৎ এত বেশি ভাঙন শুরু হয়েছিল, কিছু বুঝে উঠতে পারিনি।’

 

হিজলা উপজেলার স্কুলশিক্ষক জয়নাল মৃধা বলেন, এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে একসময় বরিশালের মানচিত্রই বদলে যেতে পারে। প্রতিনিয়ত মানুষ ভিটেমাটি, পরিচিত জনপদ ও দীর্ঘদিনের স্মৃতি হারাচ্ছেন।

 

জয়নাল মৃধা বলেন, ‘যেভাবে ভাঙন চলছে, তাতে বরিশালের মানচিত্র দিন দিন বদলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচিত, ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

 

৬০ কিলোমিটার নদীতীরে ভাঙন, তীব্রতা বেশি ২০-২৫ কিলোমিটারে

 

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৩৮টি নদ-নদী রয়েছে। এসব নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, সন্ধ্যা ও সুগন্ধাসহ আটটি নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার অংশে বর্তমানে ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি।

 

ভাঙন মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তবে নদীতীরবর্তী মানুষের দাবি, বিচ্ছিন্ন ও সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

 

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, বর্ষাকাল হওয়ায় জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন চলছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি। এসব এলাকায় জরুরি আপৎকালীন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

 

জাবেদ ইকবাল আরও বলেন, স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের কাজ করা সম্ভব হবে।

 

তবে প্রকল্প অনুমোদন ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা নদীতীরবর্তী মানুষের কাছে প্রতিটি দিনই আতঙ্কের। তাঁদের আশঙ্কা, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই হয়তো হারিয়ে যাবে আরেকটি বাড়ি, আরেকটি গ্রাম কিংবা বহু মানুষের স্মৃতিবিজড়িত কোনো জনপদ।

 

নদীভাঙনে শুধু জমির সীমানা বদলায় না, বদলে যায় মানুষের জীবনও। বসতভিটা হারানো পরিবারগুলোর কাছে এর অর্থ শুধু ঘর হারানো নয়; হারিয়ে যায় জীবিকা, নিরাপত্তা ও প্রজন্মের শেকড়। তাই সাময়িক প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকায় দ্রুত কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা বরিশালের নদীতীরবর্তী মানুষের।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৫০:১১ ● ৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ