
কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী থেকে
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, কাজ না করে অর্থ উত্তোলন এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কাজ না হওয়া, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে পুরো বিল তুলে নেওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা প্রতিটি ইউনিয়নে নিজের নিয়ন্ত্রণে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। ওই চক্রের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বরাদ্দের অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা এবং প্রকল্প সভাপতিদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো, এক ইউপি সদস্যের স্বামীর কাছে দুটি প্রকল্পের কমিশন বাবদ ৪৫ হাজার টাকা দাবি করা। পিআইও মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে এ-সংক্রান্ত একটি কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অনুসন্ধানে একাধিক প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্যের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, প্রতিটি প্রকল্প থেকে প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিল আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা। তাদের দাবি, ভালোভাবে বাস্তবায়িত প্রকল্প থেকে ২০ শতাংশ এবং নিম্নমানের কাজের প্রকল্প থেকেও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পিআইও নিজেই পছন্দের লোকজন দিয়ে প্রকল্পের কাজ করান। কোথাও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে, আবার কোথাও কোনো কাজ না করেই বরাদ্দের পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। অধিকাংশ প্রকল্প তিনি নিজে পরিদর্শন করেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অফিস সহায়ককে দিয়ে আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন দেখিয়ে বিল অনুমোদন করা হয় বলে দাবি তাদের।
দুমকি উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা, খাদ্য সহায়তা ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সরকারি বরাদ্দ আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাধারণ মানুষ এসব বরাদ্দ সম্পর্কে অবগত না থাকায় সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সরকারি অর্থের অপব্যবহার করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে লেবুখালী ইউনিয়নের প্রকল্প নম্বর-৭-এর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মকবুল শরীফের বাড়ি থেকে সিদ্দিক শরীফের দোকান পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরেজমিনে গিয়ে কোনো কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মোসা. জেসমিন বেগম বলেন, তিনি বরাদ্দ ও কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
উপজেলা পরিষদ চত্বরের প্রকল্প নম্বর-২২-এ গাড়ি ধোয়ার র্যাম্পসংলগ্ন স্থানে মাটি ভরাট ও ইট সলিংয়ের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সরেজমিনে ওই প্রকল্পের কাজের কোনো প্রমাণ মেলেনি। প্রকল্প সভাপতি চেয়ারম্যান মো. আজহার আলী মৃধার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকল্প নম্বর-৯-এ উপজেলা পরিষদের মাঠ ও ইউএনওর বাসভবনের ফুলবাগানে মাটি ভরাটের জন্য ২ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরেজমিনে কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্প সভাপতি আব্দুল জলিল বলেন, বিষয়টি পিআইও জানেন।
প্রকল্প নম্বর-৬-এ পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনী কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো কেন্দ্রে ক্যামেরা স্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কার্তিকপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ ভরাট প্রকল্পে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সরেজমিনে গিয়ে ওই নামে কোনো বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া শ্রীরামপুর, পাংগাশিয়া ও লেবুখালী ইউনিয়নের একাধিক রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে বরাদ্দের তুলনায় অতি সামান্য কাজ করে পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক প্রকল্পে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার কাজ দেখিয়ে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে।
অনিয়ম, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং স্বপরিবারে বিদেশ যাওয়ার জন্য অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে পিআইও মোহাম্মদ আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে সরাসরি দেখা করতে বলেন। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পটুয়াখালীর সহকারী কমিশনার তাপস বিশ্বাস বলেন, মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অভিযান চালিয়েছিল। ওই অভিযানের প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে বর্তমানে কমিশন না থাকায় প্রতিবেদনটি অনুমোদন হয়ে ফেরত আসেনি। অনুমোদন হয়ে এলে কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন বলেন, পিআইওর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগসংক্রান্ত একটি চিঠি এসেছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কাজী মো. বদরুউজ্জামান জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়েছে এবং সেই প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পিআইও মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে অতীতেও বিভাগীয় তদন্ত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরপরও তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি বহাল রয়েছেন।