
কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী থেকে
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধানখালী ইউনিয়নে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পর স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও আর্থসামাজিক অবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে এক গণগবেষণায় উঠে এসেছে। কৃষিজমি ও উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়ে অনেক মানুষ তাঁদের চিরাচরিত পেশা ছেড়ে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন বলে গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
গত ৩ আগস্ট ২০২৬ বেলা ১১টায় কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনের ‘পায়রা’ হলে আয়োজিত আলোচনা সভায় ‘আমাদের মাটি, আমাদের জীবন’ শীর্ষক গণগবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে পরিচালিত এ গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বুকলেটে ধানখালী ইউনিয়নের পরিবেশগত ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন কলাপাড়া পরিবেশ ও জনসুরক্ষা মঞ্চের কার্যনির্বাহী সদস্য সাংবাদিক মেজবাহউদ্দিন মাননু। প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগী কর্মসূচি কর্মকর্তা মারজিয়া জাহান। বক্তব্য দেন গণগবেষক মেহেদী হাসান ও হালিমা আয়েশা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রান্তজনের মাঠ সমন্বয়কারী সাইফুল্লাহ মাহমুদ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দা, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক ও সাংবাদিকরা অংশ নেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ধানখালীতে কয়েকটি জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পর স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ গণগবেষণায় ধানখালীর আটটি ওয়ার্ডের প্রথম পর্যায়ে ৪৫৭টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৯৬টি পরিবারের ওপর সামাজিক ও পরিবেশগত জরিপ চালানো হয়। পাশাপাশি উঠান বৈঠক ও মূল তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪৫৭ জনের মধ্যে ১৬১ জন আগে কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৫১ জন কৃষিকাজে টিকে আছেন বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ১১০ জন কৃষিপেশা ছেড়েছেন।
এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া গৃহিণীর সংখ্যা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ৯৮ জন থেকে বেড়ে ১৫২ জন হয়েছে। দিনমজুরের সংখ্যা ৪৯ থেকে বেড়ে ৭১ জন এবং বেকারের সংখ্যা ৭ থেকে বেড়ে ৩২ জন হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এসব পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা কমেছে এবং সামাজিক সংকট বেড়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ মানুষ তাঁদের অবস্থা ভালো বা খুব ভালো বলে জানিয়েছিলেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর একই মত দিয়েছেন মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। বিপরীতে ৭১ দশমিক ৩৩ শতাংশ তাঁদের বর্তমান অবস্থা খারাপ বা খুব খারাপ বলে মত দিয়েছেন।
গবেষণায় সুপেয় পানির সংকট, জলাশয়ের অবনতি, বিশুদ্ধ বাতাসের অভাব, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নারীদের ওপর প্রভাবের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মতে, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ধানখালীর নদী ও খালে ইলিশসহ ৩০টির বেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে মাছের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ধানখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একই ক্ষমতার পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। আরও একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে অন্তত ৬৮৫টি পরিবার সরাসরি বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় হাজার কৃষক ও জেলে পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়েছে বলে গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজনের উদ্যোগে পরিচালিত ও প্রকাশিত এ গণগবেষণায় সহায়তা করেছে একশনএইড বাংলাদেশ। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রকল্প এলাকার মানুষের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার ও প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।