লোডশেডিংয়ের মধ্যে মধ্যরাতে বাড়ে বিদ্যুতের অদৃশ্য চাপ

হোম » বিশেষ প্রতিবেদন » লোডশেডিংয়ের মধ্যে মধ্যরাতে বাড়ে বিদ্যুতের অদৃশ্য চাপ
রবিবার ● ১৬ আগস্ট ২০২৬


 

‘টেসলার’ চার্জেই যাচ্ছে দেশের ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ!

এলাহী আরমান

 

দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও মধ্যরাতে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে তৈরি হচ্ছে অস্বাভাবিক চাপ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা চার্জে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ এসব যানবাহন চার্জে খরচ হচ্ছে।

 

গত ৯ আগস্ট দেশে লোডশেডিং ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। প্রচণ্ড গরমে গ্রামাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। শিল্পকারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হয়। অথচ রাত ১২টার পর সাধারণত বিদ্যুতের চাহিদা ১ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট কমার কথা থাকলেও ওই সময় জাতীয় গ্রিডে উল্টো অস্বাভাবিক চাপ দেখা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং।

 

যেভাবে হচ্ছে বিদ্যুৎ চুরি

 

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মফস্বল ও বিভিন্ন শহরের অলিগলিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চললেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতার সুযোগে অনেক এলাকায় এসব বাহনের অবাধ চলাচল শুরু হয়। একপর্যায়ে রাজধানীর প্রধান সড়কেও ব্যাপকভাবে দেখা যায় ব্যাটারিচালিত রিকশা।

 

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) হিসাবে দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। শুধু ঢাকাতেই চলছে প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা।

 

একেকটি রিকশায় সাধারণত ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। এগুলো চার্জ দিতে ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ফলে প্রায় ৮ ঘণ্টা চার্জে একটি রিকশায় খরচ হয় ৯ ইউনিটের মতো বিদ্যুৎ।

 

সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ শুধু এসব রিকশা চার্জে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বড় একটি অংশ অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে নেওয়া হওয়ায় সরকার এর বিপরীতে রাজস্বও পাচ্ছে না।

 

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধ সংযোগ নিয়ে গ্যারেজে গ্যারেজে এসব রিকশা চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

বছরে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম

 

অবৈধ সংযোগের কারণে সরকার বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এই খাতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় ধরনের অনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি।

 

সিপিডির তথ্যমতে, ঢাকার প্রায় ২০ লাখ অটোরিকশার প্রতিটি থেকে গ্যারেজ ভাড়া ও চার্জ বাবদ দিনে গড়ে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এতে রাজধানীতেই প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি টাকা লেনদেন হয়। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। পুরো দেশের হিসাবে গ্যারেজকেন্দ্রিক এই লেনদেনের পরিমাণ বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোড পারমিট না থাকা এসব যানবাহনে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, অবৈধ লাইনম্যান ও বিভিন্ন সিন্ডিকেট। রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রেও অনেক চালককে বিভিন্ন স্থানে চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘অবৈধ হলেও চালকেরা চাঁদা দিয়েই সড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন। ঘাটে ঘাটে বিশাল এক অর্থনীতি জড়িত আছে। তাই এই খাত নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে।’

 

কর্মসংস্থানও বড় বাস্তবতা

 

ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। তৈরি পোশাক খাতসহ বিভিন্ন পেশায় কাজ হারানো অনেকে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই সহজে এ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। প্যাডেলচালিত রিকশার তুলনায় এতে শারীরিক শ্রম কম এবং দৈনিক আয়ও তুলনামূলক বেশি।

 

প্রায় ৭০ থেকে ৭২ হাজার টাকায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি করা সম্ভব। বিপরীতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিনতে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রয়োজন হয়। কম ভাড়া ও দ্রুত যাতায়াতের কারণে যাত্রীদের মধ্যেও এসব বাহনের চাহিদা রয়েছে।

 

গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৮২ শতাংশ যাত্রী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে তাদের প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ চালকের পরিবার এই খাতের ওপর নির্ভরশীল বলে সংশ্লিষ্ট গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

 

বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

 

তবে কর্মসংস্থানের এই বড় খাতটি একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এসব যানবাহনের অনেক চালকের প্রশিক্ষণ নেই এবং ট্রাফিক আইন সম্পর্কেও তাদের পর্যাপ্ত ধারণা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে এক বছরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসংক্রান্ত দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৭৬ জন নিহত হয়েছেন।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও জটিল হতে পারে।

 

সমাধান কোথায়

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাতারাতি ব্যাটারিচালিত রিকশা পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। শুধু সড়ক থেকে কয়েকটি রিকশা জব্দ করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

 

বরং অবৈধ যন্ত্রাংশ আমদানিকারক, রিকশার বডি প্রস্তুতকারক, অবৈধ গ্যারেজ এবং বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে এসব যানবাহনের নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং বৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে যৌথভাবে দায়িত্ব ভাগ করে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ চার্জিং গ্যারেজে কঠোর অভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

ব্যাটারিচালিত রিকশা একদিকে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস, অন্যদিকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও সরকারি রাজস্বের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তাই শুধু রিকশা নিষিদ্ধ না করে বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ, অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে এ খাতকে নিয়ন্ত্রণ করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।

বাংলাদেশ সময়: ৮:০২:৫১ ● ২৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ