মাস্টারপ্ল্যান আছে, বাস্তবায়ন নেই অপরিকল্পিত উন্নয়নে কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা

হোম » কুয়াকাটা » মাস্টারপ্ল্যান আছে, বাস্তবায়ন নেই অপরিকল্পিত উন্নয়নে কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা
শনিবার ● ১৫ আগস্ট ২০২৬


 

মাস্টারপ্ল্যান আছে, বাস্তবায়ন নেই: অপরিকল্পিত উন্নয়নে কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা

সাগরকন্যা বিশেষ প্রতিবেদন

 

দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগের কারণে ‘সাগরকন্যা’ নামে পরিচিত এই সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে রয়েছে বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা। দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে কুয়াকাটা হতে পারে আন্তর্জাতিক মানের একটি পর্যটননগরী। সেই লক্ষ্যেই এক যুগেরও বেশি আগে প্রণয়ন করা হয়েছিল মাস্টারপ্ল্যান।

 

কিন্তু ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৩ বছর। এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি সেই পরিকল্পনা। বরং মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ না থাকায় কুয়াকাটায় অনেক ক্ষেত্রেই এগোচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। সৈকতসংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু করে পৌরসভার বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠছে হোটেল, রিসোর্ট ও বহুতল ভবন।

 

অন্যদিকে কক্সবাজারকে ঘিরে যখন একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ চলছে, তখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা এখনো অপেক্ষায় রয়েছে নিজস্ব পরিকল্পিত উন্নয়নের।

 

এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি মাস্টারপ্ল্যান

 

কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটননগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ২০১৩ সালে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর পরিকল্পনাটির গেজেট প্রকাশ হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন কিছু উন্নয়ন পরিকল্পনা যুক্ত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন ও সমন্বয়ের জটিলতায় মূল পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে।

 

এর সুযোগে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের প্রবণতা বাড়তে থাকে। পর্যটকের চাপ সামলানোর জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক, ড্রেনেজ, সুয়ারেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সমন্বিতভাবে গড়ে না উঠলেও বাড়ছে ভবনের সংখ্যা।

 

কুয়াকাটা পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পৌর এলাকায় আবাসিক হোটেলের সংখ্যা প্রায় ১৭০টি। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটির। ফলে বিপুলসংখ্যক হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যক্রম চালালেও সেগুলোকে এখনো পুরোপুরি পরিকল্পিত নগরায়ণের কাঠামোর মধ্যে আনা যায়নি।

 

অনুমোদনের জটিলতায় থমকে বিনিয়োগ

 

কুয়াকাটায় নতুন ভবন নির্মাণ বা বড় ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বাধীন কমিটির অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অনুমোদনের এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় অনেক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী শেষ পর্যন্ত আগ্রহ হারাচ্ছেন।

 

পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডে নির্মাণাধীন পানশি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের শেয়ারহোল্ডার এস এম আলমাস বলেন, ‘২০১৬ সালে ১৯ শেয়ারহোল্ডার মিলে হোটেল নির্মাণের উদ্যোগ নিই। সরকারি সব নিয়ম মেনে আবেদন করলেও দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে এখনো মেলেনি চূড়ান্ত অনুমোদন। এমন অনেক ভবনের অনুমোদন ও জমি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে থমকে আছে সম্ভাব্য বিনিয়োগ।’

 

উদ্যোক্তাদের মতে, অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার প্রভাব শুধু হোটেল ও পর্যটন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। জমি কেনাবেচাসহ স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

 

পদ্মা সেতুর সুফল ধরে রাখা যায়নি

 

২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের পর্যটনশিল্পে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কুয়াকাটায় সড়কপথে যাতায়াত সহজ হওয়ায় পর্যটক বাড়ার প্রত্যাশা করেছিলেন ব্যবসায়ীরা।

 

শুরুতে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলনও দেখা যায়। কয়েক বছর কুয়াকাটায় পর্যটকের উল্লেখযোগ্য চাপ ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়ায় সেই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়নি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

 

কুয়াকাটার শিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের এজিএম আলামিন খান বলেন, ‘২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালুর পর কুয়াকাটায় পর্যটকের ঢেউ বাড়ছিল ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ায় এখন শুধু কমছে। এতে লোকসানে পড়ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।’

 

এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা

 

পর্যটননগরীর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি এখন নাগরিক অবকাঠামো। পর্যটন মৌসুমে হাজারো মানুষের সমাগম হলেও কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় আধুনিক ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

 

ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি স্বল্প সময়ের বৃষ্টিতেও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সদর রোডের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে প্রায় এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই সড়কে পানি জমে যায়। এতে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি হয়।

 

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ ধরনের নাগরিক দুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কুয়াকাটার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুধু নতুন হোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ নয়, পর্যটননগরীর মৌলিক নাগরিক অবকাঠামো নিশ্চিত করাও এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দাবি

 

কুয়াকাটার পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, একাধিক সরকারি সংস্থার পৃথক সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনের কারণে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয়, সৈকত রক্ষায় স্থায়ী প্রকল্প, দ্রুত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ, মহাসড়ক উন্নয়ন এবং আধুনিক ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়বে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্র।’

 

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম মোতালেব শরীফ বলেন, ‘অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও ঝুলে আছেন প্রশাসনিক জটিলতায়। তাই দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন সময়ের দাবি।’

 

পরিবেশও পড়ছে ঝুঁকিতে

 

কুয়াকাটার উন্নয়ন পরিকল্পনার দীর্ঘসূত্রতা শুধু অর্থনীতি ও পর্যটন অবকাঠামোর জন্যই নয়, উপকূলীয় পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উপকূলীয় ক্ষয় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি কুয়াকাটার ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

 

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিজাস্টার রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রমন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘২০১৩ সালের মাস্টারপ্ল্যান দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন না হওয়ায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের কারণে কুয়াকাটার উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও পর্যটন পরিবেশ ঝুঁকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় ক্ষয় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ছে। পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিতকরণ এবং একটি স্বতন্ত্র কুয়াকাটা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি গঠনের বিকল্প নেই।’

 

ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রশাসনের

 

কুয়াকাটায় অনুমোদন ছাড়া যেসব ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

 

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। অনুমোদন ছাড়া যেসব ভবনের নির্মাণকাজ চলছে, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী এসব ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

তবে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) সোহরাব হোসেন বলেন, পরিকল্পনাটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করেছে। এটি কেন এখনো বাস্তবায়ন হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ই সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবে। অনুমোদনের বিষয়টি একটি কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে করা হয়, এতে কিছুটা সময় লাগবে।

 

সম্ভাবনার কুয়াকাটা, প্রয়োজন এখন সিদ্ধান্তের

 

কুয়াকাটার সামনে সম্ভাবনার কমতি নেই। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়েছে। সমুদ্রসৈকত, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, পর্যটন অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগ এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত অর্থনৈতিক পরিসর- সব মিলিয়ে কুয়াকাটা হতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটননগরী।

 

কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে হোটেল, রিসোর্ট কিংবা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত নগর-পরিকল্পনা, কার্যকর ভূমি ব্যবহার নীতি, পরিবেশ সুরক্ষা, আধুনিক ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব অনুমোদন প্রক্রিয়া।

 

এক যুগ আগে যে মাস্টারপ্ল্যান কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটননগরীর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেটি এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে অপরিকল্পিত স্থাপনার চাপ। ফলে প্রশ্ন উঠছে- মাস্টারপ্ল্যান কি শুধু গেজেটের পাতাতেই থাকবে, নাকি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কুয়াকাটাকে সত্যিকার অর্থে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটননগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে?

 

কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এখন এই প্রশ্নের কার্যকর উত্তর ও দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপের ওপর।

বাংলাদেশ সময়: ১২:১৪:০৯ ● ২২ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ