
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কয়রা (খুলনা)
উপকূলীয় জনপদ খুলনার কয়রায় পল্লী বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় দিনে-রাতে মিলিয়ে গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ পাচ্ছেন মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। এতে তীব্র গরমে জনজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্যসম্পদনির্ভর এ উপজেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। বাসাবাড়িতে পানির মোটর চালানো, মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। রাতের বেলা ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক ঘুমও।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, সেচ ও শিল্প খাত মিলিয়ে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহক প্রায় ৮৫ হাজার। এসব গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১২ মেগাওয়াট। বিপরীতে বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে কয়রা অঞ্চলে ৩ থেকে সাড়ে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানের কারণে উপজেলাজুড়ে পর্যায়ক্রমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
কয়রা উপজেলার পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘উপজেলায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ১২ মেগাওয়াটের বিপরীতে আমরা সরবরাহ পাচ্ছি মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৪ মেগাওয়াট। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বণ্টন সামাল দিতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরবরাহ বৃদ্ধি ছাড়া এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।’
বরফ সংকটে হুমকিতে মৎস্য খাত
কয়রা উপজেলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি ঘেরের সাদা মাছ ও গলদা-বাগদা চিংড়ি। এসব মাছ খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে বরফ অপরিহার্য। তবে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উপজেলার বরফকলগুলোতে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। সময়মতো পর্যাপ্ত বরফ না পাওয়ায় আড়ত ও ঘের থেকে সংগৃহীত মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাজারে বরফের সংকট তৈরি হওয়ায় চড়া দামে বরফ কিনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এতে মৎস্যচাষি ও আড়তদারদের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন্ধের মুখে রাইস মিল ও ক্ষুদ্র কারখানা
বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। ধান, চাল ও তেল মাড়াইয়ের রাইস মিলগুলো নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় শ্রমিকদের অলস সময় পার করতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মিল মালিকদের পাশাপাশি দিনমজুর শ্রমিকরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
এ ছাড়া কম্পিউটার, অনলাইন সেবা, ফটোকপি, মোবাইল সার্ভিসিং ও ইলেকট্রনিকসের দোকানগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে ব্যবসা সচল রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ বহন করতে হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
কয়রা উপজেলা মৎস্য ব্যবসায়ী মো. আকবার হোসেন বলেন, ‘উপকূলীয় কয়রার অর্থনীতি এমনিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ। তার ওপর বিদ্যুৎ সংকটের কারণে যদি বরফকল ও মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। দ্রুত কয়রা উপজেলায় বিদ্যুতের বরাদ্দ বাড়িয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক করার জন্য সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।’