প্রবীণদের রিলস আসক্তি: বিনোদন, নাকি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি?

হোম » লাইফস্টাইল » প্রবীণদের রিলস আসক্তি: বিনোদন, নাকি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি?
শনিবার ● ১১ জুলাই ২০২৬


প্রতীকী চিত্র

 

সাগরকন্যা লাইফস্টাইল ডেস্ক

 

একসময় স্মার্টফোনে অতিরিক্ত সময় কাটানো নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ছিল তরুণদের ঘিরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন অনেক প্রবীণও দিনের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কাটান ফেসবুক স্ক্রল করে, ইনস্টাগ্রামের রিলস দেখে, ইউটিউবে ভিডিও উপভোগ করে কিংবা মোবাইলে বিভিন্ন খেলা খেলেই।

 

বিশেষ করে যাঁরা অবসরজীবনে একা থাকেন বা পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে সময় কাটান, তাঁদের কাছে স্মার্টফোন যেন একঘেয়েমি দূর করার সহজতম সঙ্গী। তবে প্রশ্ন হলো এই অভ্যাস কতটা উপকারী, আর কখন তা স্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঝুঁকিতে পরিণত হয়?

 

প্রযুক্তি সবসময় ক্ষতিকর নয়

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনভাবে ব্যবহার করলে স্মার্টফোন প্রবীণদের জন্য আশীর্বাদও হতে পারে। দূরে থাকা সন্তান-সন্ততি বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা, বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইনে দাবা বা লুডু খেলা, ধর্মীয় আলোচনা শোনা, নতুন কিছু শেখা কিংবা প্রিয় গান ও নাটক উপভোগ করা এসবই মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। এতে একাকীত্ব কমে, সামাজিক যোগাযোগ বজায় থাকে এবং মানসিকভাবে সক্রিয় থাকাও সহজ হয়।

 

কখন উদ্বেগের কারণ?

 

সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন স্মার্টফোনই দিনের প্রধান বা একমাত্র বিনোদনে পরিণত হয়।

 

যদি একজন প্রবীণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস বা ছোট ছোট ভিডিও দেখতে থাকেন, সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেন, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম বাদ দেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাবার্তা কমিয়ে দেন কিংবা গভীর রাত পর্যন্ত ফোন ব্যবহার করেন, তাহলে সেটি আসক্তির লক্ষণ হতে পারে।

 

শরীরের ওপর কী প্রভাব পড়ে?

 

দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে মোবাইল ব্যবহার করলে শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যায়। এতে ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি ঘাড়, কোমর ও হাঁটুর ব্যথা, চোখে জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

 

রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইলের পর্দার আলোয় চোখ রাখলে স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হয়। পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম না হলে পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, খিটখিটে মেজাজ এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব

 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একের পর এক অল্প সময়ের ভিডিও দেখার অভ্যাস মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক উদ্দীপনার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে বই পড়া, দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে কোনো অনুষ্ঠান দেখা বা অন্য কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে।

 

বিভিন্ন গবেষণায় অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে উদ্বেগ, একাকীত্ব, মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতার সম্পর্কও উঠে এসেছে।

 

পরিবারের ভূমিকা

 

প্রবীণদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা কোনো কার্যকর সমাধান নয়। বরং তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, বই পড়া, বাগান করা, ধর্মীয় বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য উৎসাহ দিতে পারেন। একই সঙ্গে খাবারের সময় এবং পারিবারিক আড্ডায় মোবাইল দূরে রাখার অভ্যাসও গড়ে তোলা উচিত।

 

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ

 

স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই প্রবীণদের প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে যদি এর কারণে ঘুম, শারীরিক চলাফেরা, সামাজিক সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

 

প্রযুক্তি তখনই মানুষের উপকারে আসে, যখন তা জীবনকে সহজ ও সমৃদ্ধ করে। কিন্তু প্রযুক্তিই যদি সময়, মনোযোগ ও জীবনযাপনের বড় অংশ দখল করে নেয়, তাহলে তা ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই প্রবীণদের জন্যও প্রয়োজন সচেতন, সংযত ও পরিমিত স্মার্টফোন ব্যবহার।

 

সূত্র: ফোর্বস এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন।

বাংলাদেশ সময়: ১২:০৪:৫৫ ● ২৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ