বেনাপোলে কাস্টমস, আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীসহ ৬১ জনের নামে মামলা

হোম » খুলনা » বেনাপোলে কাস্টমস, আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীসহ ৬১ জনের নামে মামলা
সোমবার ● ২৯ জুন ২০২৬


 

বেনাপোলে কাস্টমস, আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীসহ ৬১ জনের নামে মামলা

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বেনাপোল (যশোর)

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে পণ্য পাচার, ঘোষণাবহির্ভূত মালামাল প্রবেশ, শুল্ক ফাঁকি ও গোডাউন থেকে পণ্য চুরির একাধিক ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে পৃথক চারটি ঘটনায় কাস্টমস, বন্দর, আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি, আমদানিকারক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ মোট ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে এখনো অধিকাংশ আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ ও বন্দর সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন আগে কাগজপত্রবিহীন একটি ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাক জব্দ করে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় একটি বাংলাদেশি ট্রাক ও এর চালককে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। একই সঙ্গে বন্দরের আনসার সদস্য ও বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মীসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

গত ২৭ জুন বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. ওবাইদুল মিয়া বাদী হয়ে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলাটি করেন।

বন্দর ও কাস্টমস সূত্র জানায়, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরাফ এন্টারপ্রাইজের নামে সরিষার খৈলবাহী একটি ভারতীয় ট্রাক গত ২৩ জুন রাতে বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করে। পরে ২৫ জুন ট্রাকটি ৩৫ নম্বর শেডে খালাস দেখিয়ে বের করে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, ট্রাকটি থেকে ৫০ বস্তা ঘোষণাবহির্ভূত শাড়ি, থ্রি-পিস ও প্রসাধনী সামগ্রী ৩২ নম্বর ইয়ার্ডে একটি বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তর করা হয়।

পরবর্তীতে ভারতীয় ট্রাকটি বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ৩১ নম্বর ইয়ার্ডে প্রবেশ করলে সেটি আটক করা হয়। কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামীর উপস্থিতিতে ট্রাকটি তল্লাশি করা হলে ঘোষিত ওজনের তুলনায় ২ হাজার ৭৮৪ কেজি পণ্যের ঘাটতি ধরা পড়ে। এ সময় ১৪০ বস্তা সরিষার খৈল ও ৫০টি খালি বস্তা জব্দ করা হয়।

ঘটনার পর ভারতীয় ট্রাকচালক পালিয়ে গেলেও বাংলাদেশি ট্রাক ও এর চালককে আটক করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পণ্য পাচারচক্র মেসার্স প্রত্যয় ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক কাজী রতন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গেট পাস ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ছাড়াই ট্রাক চলাচল ও পণ্য অপসারণে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে নিরাপত্তাকর্মী, ট্রাকচালকসহ সংশ্লিষ্ট ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেন বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, প্রতিটি আমদানিকৃত ট্রাক বিজিবির তল্লাশি, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের ওজন পরীক্ষা এবং স্ক্যানিংয়ের মধ্য দিয়ে বন্দরে প্রবেশ করে। এছাড়া বন্দরে প্রায় ৩৭৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য প্রবেশের ঘটনা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে চলতি মাসে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্য পাচার ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে আরও দুটি মামলা করেছে। এসব মামলায় বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধি ও আমদানিকারকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে প্রায় দেড় কোটি টাকার পণ্য পাচারের ঘটনায় বিজিবি কাস্টমস কর্মকর্তাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করে। ওই ঘটনায় তিনজনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এর আগে প্রায় সাত কোটি টাকার আমদানি পণ্য পাচারের অভিযোগে আরও একটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক চারটি মামলায় মোট ৬১ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কাস্টমস সূত্র জানায়, গত ৭ জুন ভারত থেকে আমদানিকৃত একটি চালানে ঘোষণাবহির্ভূত ৩০ কার্টুন শাড়ি ও ২০ কার্টুন ফেসওয়াশ জব্দ করা হয়। এসব পণ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া গত ১২ মার্চ ‘বেকিং পাউডার’ ঘোষণা দিয়ে প্রায় ছয় কোটি টাকার শাড়ি ও থ্রি-পিস আমদানির অভিযোগে শাফা ইমপেক্সের একটি চালান আটক করা হয়। পরে বন্দরের ৩৭ নম্বর শেডে সংরক্ষিত ওই চালান থেকে মূল্যবান ভারতীয় পণ্য রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব পরিশোধের নোটিশ দিয়েছে।

অভিযোগের পর বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট শেড ইনচার্জকে প্রত্যাহার করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং উপপরিচালক (ট্রাফিক) মো. রুহুল আমিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

এ ছাড়া ‘নুসরাত ট্রেডিং’ এর আমদানিকৃত একটি চালানে ঘোষণাবহির্ভূত ৬৭৯ পিস ভারতীয় শাড়ি জব্দ করা হয়। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে এসব পণ্য উদ্ধার করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, এতে প্রায় এক কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল।

এসব ঘটনায় গত ১৪ জুন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান ও কাজী নাঈম উদ্দীন পৃথক দুই মামলায় ২৪ জনকে আসামি করেন। এর আগে ৯ জুন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহামুদুল আরেফিন আরেকটি মামলায় ১৯ জনকে আসামি করেন।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামীম হোসেন বলেন, ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বন্দর, কাস্টমস বা ব্যবসায়ী- অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, বন্দরের শেড থেকে পণ্য পাচারের ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। যে কোনো মূল্যে এ ধরনের অপরাধ দমন করা হবে।

বেনাপোল পোর্ট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাশেদুজ্জামান বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত চলছে। অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার ও লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সাইদ আহমেদ রুবেল জানান, গত কয়েক মাসে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আনার অভিযোগে ১৪টি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ২৫ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা হয়েছিল। এ কারণে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৬:৪২:৩৭ ● ১৩ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ