মহিপুর-আলীপুরে অবৈধ ট্রলিংয়ের বিস্তার, হুমকিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ

হোম » জেলে-মৎস্য » মহিপুর-আলীপুরে অবৈধ ট্রলিংয়ের বিস্তার, হুমকিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ
সোমবার ● ২৯ জুন ২০২৬


মহিপুর-আলীপুরে অবৈধ ট্রলিংয়ের বিস্তার, হুমকিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদএ.এম. মিজানুর রহমান বুলেট, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) থেকে

 

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা এবং তার পার্শ্ববর্তী আশাখালী ও মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবৈধ ও রূপান্তরিত ট্রলিং বোটের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলে, মৎস্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় জেলেদের জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, মহিপুর-আলীপুর এলাকায় গত বছর প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় থাকলেও চলতি বছর সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। অভিযোগ রয়েছে, দ্রুত মুনাফার আশায় অনেক সাধারণ কাঠের ট্রলার ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে।

 

মৎস্যজীবীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী বড় ট্রলিং বোটের গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারের কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এসব বোট উপকূলীয় অগভীর জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ আহরণ করছে। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রলিং বোটে ব্যবহৃত ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভারী জালের কারণে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং বিভিন্ন অণুজীবের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও উৎপাদনও কমে যেতে পারে।

 

এ ছাড়া এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মাছের অবস্থান শনাক্ত করে ব্যাপক হারে আহরণ সম্ভব হচ্ছে। এতে ছোট নৌকা ও সাধারণ ট্রলারনির্ভর জেলেরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

মহিপুর ও আলীপুর এলাকার জেলেরা জানান, বড় ট্রলিং বোট অনেক সময় তাদের পাতা জালের ওপর দিয়ে চলাচল করে। এতে জাল ছিঁড়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। প্রতিবাদ করলে হুমকি-ধমকির ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ করেন তারা।

 

মহিপুরের জেলে বেল্লাল হোসেন বলেন, আমরা দিনের পর দিন সমুদ্রে গিয়ে মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসি। অথচ কিছু প্রভাবশালী ট্রলার মালিক অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে সাগরের মাছ ও পোনা নিধন করছে। প্রশাসন চাইলে একদিনেই এসব বন্ধ করতে পারে, কিন্তু রহস্যজনক কারণে করছে না।

 

আশাখালীর জেলে আবুল কাশেম বলেন, ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ রেণু নিধন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে জেলেদের মাছ ধরার মতো কিছুই থাকবে না।

 

মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র দূষণ এবং অবৈধ ট্রলিং- এই তিন কারণে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা মা মাছ ও পোনা নিধনের ফলে প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব ইলিশ, পোয়া, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের উৎপাদনে পড়তে পারে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় এবং নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

জেলেদের একটি অংশের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নৌ পুলিশের একটি অংশের পরোক্ষ সুবিধার কারণেই বছরের পর বছর এসব অবৈধ ট্রলার সাগরে মাছ শিকার করছে। তবে অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

মহিপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী বলেন, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু তেমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি। বরং আগের তুলনায় দিন দিন এটি বাড়ছে। প্রশাসন কঠোর নজরদারি না করলে এ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

 

কলাপাড়া ফিশারিজ কর্মকর্তা মো. বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অবৈধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন হচ্ছে। এতে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষায় অবৈধ জাল বন্ধ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।

 

কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। অবৈধ মৎস্য শিকার ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে আমরা তৎপর রয়েছি। তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

 

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এরপরও ট্রলিং বোট বন্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

 

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ট্রলিং বোটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে উপকূলীয় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ মারাত্মক সংকটে পড়বে। এর প্রভাব পরিবেশের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৪১:২৫ ● ১৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ