অবিভক্ত বাংলার সমাজসংস্কারক মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল

প্রথম পাতা » বরিশাল » অবিভক্ত বাংলার সমাজসংস্কারক মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল
বুধবার ● ২৫ জানুয়ারী ২০২৩


অবিভক্ত বাংলার সমাজসংস্কারক মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল

গৌরনদী (বরিশাল) সাগরকন্যা প্রতিনিধি॥

বিংশ শতাব্দীতে সমগ্র ভারতবর্ষে যে ক’জন নিপীড়িত মানব দরদী ও সমাজ সংস্কারক বাগ্মী ও দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ রাজনৈতিক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের আবির্ভাব ঘটেছিল মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল তাঁদের পূরোধা। ভারতবর্ষের অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের বরিশাল (তৎকালীন বাকেরগঞ্জ) জিলার গৌরনদী থানার অন্তর্গত মৈস্তারকান্দি গ্রামের একটি (তথাকথিত) নমঃশূদ্র কৃষক পরিবারে ১৯০৪ খ্রীষ্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারি বৃহষ্পতিবার মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম রাম দয়াল মন্ডল, মাতার নাম সন্ধ্যাদেবী। তিঁনি ছিলেন পিতামাতার ষষ্ঠ ও সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান। মৈস্তারকান্দি গ্রামের বালাবাড়ির পাঠশালায় যোগেন্দ্রনাথ নি¤œ প্রাথমিক শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পাঠশালা জীবন থেকেই যোগেন্দ্র নাথের মহত্ব ও উদারতার পরিষ্ফুটন পরিলক্ষিত হয়েছিল বলে পাঠশালার শিক্ষকরা বলেছিলেন যে, “এ শিশু একদিন মহত্ব ও উদারতার প্রতীক হিসেবে দেশ ও দশের শ্রদ্ধা অর্জন করতে সমর্থ হবে।” যোগেন্দ্রনাথের ঘটনাবহুল বাল্যজীবন - বন্ধুপ্রীতি, করুণা, মমতা, উদারতা ও দৃঢ়সংকল্পের বহু দৃষ্টান্ত বহন করে। পরবর্তীকালে এই সকল সদগুণরাজির অঙ্কুরই বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ¯েœহ-মমতার উষ্ণ আবেষ্টনে, নৈসর্গিক শোভা সম্পদের সুখময় পরিবেশে লাস্যে-হাস্যে, ক্রীড়া-কৌতুকে যোগেন্দ্রনাথের মধুর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল।
কৈশোরে যোগেন্দ্রনাথ বার্থী তাঁরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন। বার্থী স্কুলে অধ্যায়নকালে তিঁনি সকল শ্রেণীতে, সকল সাবজেক্টে সর্বাধিক নম্বর অর্জনসহ ১ম স্থান অধিকার করার কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী হিসেবে শৈশব হতেই যোগেন্দ্রনাথ “স্মৃতিধর” ও “শ্রুতিধর” বলে আখ্যায়িত হয়োছিলেন। এই বিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে তথাকথিত উচ্চ বর্ণের সহ-শিক্ষার্থীদের দ্বারা শ্রেণীকক্ষের মধ্যে সৃষ্ট বর্ণ বৈষম্যৈর একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি একাই মোকাবেলা করে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিরপেক্ষ বিচারে যোগেন্দ্রনাথ বিজয়ী হয়েছিলেন এবং বর্ণ বৈষম্যের যাঁতাকলে হাজার হাজার বৎসরব্যাপী তফসিল জাতির মানবকূল কিরূপ অব্যক্ত বেদনায় দিনাতিপাত করে আসছিল যাহা যোগেন্দ্রনাথ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতেছিলেন ওই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যানকালেই। ১৯২৪ সালে সংষ্কৃতে এবং অঙ্কশাস্ত্রে উল্লেখযোগ্য নম্বর পেয়ে ওই মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে যোগেন্দ্রনাথ প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়োছিলেন।
মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে ১৯২৬ সালে আই.এ এবং ১৯২৯ সালে গণিত এবং সংস্কৃতে বিশেষ কৃতিত্বের সহিত বি.এ পাশ করেন। তিনি ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে ক্যালকাটা আইন কলেজ থেকে এল.এল.বি পাশ করেন এবং কলিকাতার (এস.সি.সি) ছোট আদালতে শিক্ষানবীশ হিসাবে যোগদান করেছিলেন। তিঁনি ১৯৩৬ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যালকাটা এবং ওই বছর ২৫ জুলাই বরিশাল বার কাউন্সিলে যোগদান করে আইন ব্যবসা শুরু করেছিলেন।
আইন ব্যবসায় যোগেন্দ্রনাথের অর্থ উপার্জনই একমাত্র লক্ষ্য ছিল না; জনসেবা ছিল তার প্রধান লক্ষ্য; তাই তিঁনি সততার সাথে আইন ব্যবসায় করতেন। দুস্থ দরিদ্র ও অসহায়, দরিদ্র কৃষক ও শিল্পীকুলের মোকদ্দমা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে বিনা পারিশ্রমিকে তিনি মামলার সুরাহা করে দিতেন এবং এটাই তিঁনি জীবনের অন্যতম ব্রত বলে গ্রহন করেছিলেন। এ বিষয়ে বরিশাল বারের অর্থলিপ্সু অন্যসব উকিলদের একাংশ যোগেন্দ্রনাথের উপর অসন্তোষ এবং ক্রুদ্ধ ছিলেন এবং কোন কোন উকিল বাবুরা যোগেন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে বলিতেন, “এটা ব্যবসাক্ষেত্র, দানছত্র নহে; দয়া-ধর্ম প্রকাশের স্থান ঋষির তপোবন, আদালত নহে।” কিন্তু অর্থলিপ্সু উকিলদের শ্লেষবাক্য তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সহিত উপেক্ষা করে কর্তব্য পরায়ন ও করুণা মমতার দুর্লভ আধার যোগেন্দ্রনাথ ওকালতির কাজ অব্যাহত রাখার ফলে তাঁর আয়ের পথ কিছুটা সংকুচিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তার জনপ্রিয়তা ও মহত্ব বিকাশের পথও প্রশস্ত হয়েছিল বহুগুণে। অতি অল্প কালের মধ্যে তিনি একজন জনপ্রিয় ও প্রতিপত্তিশালী উকিল বলে সমগ্র বাকেরগঞ্জে (বরিশাল) খ্যাতিলাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন ; ফলে ১৯৩৭ সালে বরিশাল সদর লোকাল বোর্ডের নির্বাচনে জয়লাভ করতে সহজ হয়েছিল। তিঁনি বিপুল ভোটাধিক্যে গৌরনদী থানা হতে বরিশাল সদর লোকাল বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। যোগেন্দ্রনাথের এই জয়যাত্রায় চারিদিকে একটা চাঞ্চল্য ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল। যোগেন্দ্রনাথের প্রতিভা বিকাশের পথে এই জয়যাত্রা শুভ সূচনায় দূর ভবিষ্যতের একটা স্বর্ণঝলক উদ্ভাসিত হয়েছিল। বারের উকিল বাবুরা যোগেন্দ্রনাথের এই সাফল্যে যেন কতকটা ¤্রয়িমান হয়ে পড়েছিল এবং যোগেন্দ্রনাথের প্রতি একটা বিরক্তিজনক মনোভাব বিনিময় করতে লাগল। কিন্তু যোগেন্দ্রনাথ এসব দিকে দৃকপাত না করে পূর্ণোদ্যমে তাঁর কর্তব্য পালনে কাউকে পরোয়া করেননি। লোকাল বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান পদে যোগেন্দ্রনাথকে নির্বাচিত করা হবে জানতে পেরে ওই পদে অধিষ্ঠিত না হওয়ার জন্য তিনি অস্বীকৃতি জানালেন। কেননা ওই পদে আইন বর্হিভুত পন্থায় অর্থাগমের সুযোগ থাকার বিষয়টি তিনি অবহিত ছিলেন। তাঁর অনিচ্ছার কথা জানতে পেরে  বোর্ডের সদস্যগণ বিশিষ্ট মুসলমান ও হিন্দু নেতারা তাঁকে উক্ত পদটি গ্রহণের চেষ্টায় সফল হননি যোগেন্দ্রনাথের নিষ্কলুশ চরিত্রের দৃঢ়তার প্রত্যয়ে। ১৯৩৭ সালেই যোগেন্দ্রনাথকে বরিশাল জেলা বোর্ডের সদস্য মনোনীত করা হয়েছিল। ফলে জেলার সর্বত্র তাঁহার সুনাম প্রতিষ্ঠিত হল ক্রমবর্ধমানভাবে এবং তিঁনি জনগণের উন্নতিকল্পে জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে সচেষ্ট হয়েছিলেন। জেলা পরিষদের সদস্য এবং লোকাল বোর্ডের নির্বাচিত সদস্য হিসাবে জনগণের সার্বিক দুঃখ-কষ্ট এবং তাদের জীবনমানের দুরাবস্থা দেখার সুযোগ অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে তাহা দূর করার কি ব্যবস্থা করা যায় সে ভাবনায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় স্থান করে নিতে না পারলে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের সার্বিক উন্নয়ন করা যাবে না। সে চিন্তায় তিঁনি স্থির সিদ্ধান্ত নিলেন শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠান একান্ত প্রয়োজন।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় ভারতবর্ষে প্রথম সাধারণ (General) নির্বাচনের আয়োজন। নির্বাচনী অর্থ ব্যয়ে যোগেন্দ্রনাথ অত্যন্ত দূর্বল হওয়া সত্ত্বেও তিনি ৩৩ বৎসর বয়সে বরিশাল সদর উত্তর (+) দক্ষিণ (+) ভোলা মহাকুমাসহ ১৬টি থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকায় তফসিলী জাতির জন্য কোন আসন সংরক্ষিত ছিল না ; যোগেন্দ্রনাথ এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর শুভাকাঙ্খী বন্ধুরা অর্থের যোগান দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করেন। নির্বাচনী এলাকার তফসিলী জাতির লোকজনসহ অন্যান্য জাতির কতশত লোকজন যোগেন্দ্রনাথের পক্ষে নির্বাচনে নিজ নিজ অর্থ ব্যয়ে তাঁর বিজয়ের জন্য নির্বাচনী প্রচার কার্য্য পরিচালনা করেছিল তাহার সংখ্যা নিরূপন করা সম্ভব ছিল না। নির্বাচনী এলাকায় যোগেন্দ্র সমর্থক লোকদের কংগ্রেস সমর্থক ভোটারগণ অনেক মারপিট ও হাঙ্গামা করা সত্বেও যোগেন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তাকে দমাতে পারে নাই।
১৯৩৭ সালের ২৬শে জানুয়ারি ভোট গ্রহণ হয়েছিল। ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৭ সালের ৬ফেব্রুয়ারি। বরিশালের রিট্যারনিং অফিসার ও জিলা ম্যাজিষ্ট্রেট ঘোষণা করলেন, “শ্রী যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল” কংগ্রেস মনোনিত প্রার্থী সরল দত্তকে বিপুল ভোটাধিক্যে পরাজিত করে বাংলা প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।” হাজারো জনতা যোগেন্দ্রনাথের নামে জয়ধ্বনী দিতে দিতে তাঁর বাসভবনে সমবেত হয়ে মিষ্টি বিতরণ করেন। তাঁর সমর্থক সকল শ্রেণী, পেশা ও ধর্মের লোকদের সে যে কি আনন্দ ও উৎসাহ দেখাগেছিল তাহা বর্ণনাতীত। নির্বাচনে জয়লাভ করায় যোগেন্দ্রনাথের সাফল্যে খোদ মহাত্মা গান্ধীজি যোগেন্দ্রনাথকে অভিনন্দন জানিয়ে সংক্ষেপে মন্তব্য প্রকাশ করেছিলেন যে, “প্রকৃত জনসেবকের সাফল্য লাভের জন্য কোন মার্কার প্রয়োজন হয় না। তাঁর একমাত্র মার্কা হল জনসেবা ও জনপ্রীতি।”
এম.এল.এ নির্বাচিত হয়ে যোগেন্দ্রনাথ প্রথমেই আগৈলঝাড়ার ভেগাই হালদার পাবলিক একাডেমী নামক জুনিয়র ইংরেজী বিদ্যালয়টিকে ঢাকার তৎকালীন (বৃটিশ) ডি.পি.আই এর কোনরূপ সুপারিশ ব্যতিরেকে স্থায়ী রিকগনিশনসহ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। গোলপাতা ও বাঁশের কাঠামোর পরিবর্তে বিদ্যালয়টিকে টিন ও কাঠের কাঠামোর দ্বারা সংস্কার, ছাত্র সংখ্যা ৯৩ জন থেকে ৩০০ তে উন্নীত কয়ে এবং জেলা পরিষদের মালিকানায় লিজ নেওয়া ভুমির উপর অবস্থিত বিদ্যালয়টিকে ভূমির চিরস্থায়ী লিজ প্রদানের ব্যবস্থা করেন তিঁনি। ইহা ছাড়াও যোগেন্দ্রনাথের প্রচেষ্টায় সরকারী অনুদানের আওতাভূক্ত করে নি¤েœাক্ত বিদ্যালয়গুলি ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হইয়ছিল

 

  1. Moistarkandi Final Primary,
  2. Bakai Lower Primary,
  3. Bahadurpur Final Primary,
  4. Goaila Primary,
  5. Basail Final Primary,
  6. Bakpara Primary,
  7. Ambari Final Primary,
  8. Andharmanik Primary,
  9. Nazirpur Final Primary,
  10. Askor Final Primary,
  11. Askor Girls’ Primary,
  12. Sarbari Primary,
  13. Chandah Primary,
  14. Bakpara Final Primary,
  15. Mollapara Final Primary,
  16. Chandshi Primary,
  17. Mahilara Final Primary,
  18. Chandrahar Girls’ Primary,
  19. Ashok Sen Girls’ Primary,
  20. Charu Khan ME Primary,
  21. Sreemonto Kathi ME Primary,
  22. Kodaldhoa Final Primary

বরিশাল জেলায় অদ্যাবধি কোন রেল লাইন নাই। ১৯৩৮ সালেই বাংলা প্রদেশের বাজেট সেসনে বক্তৃতায় খুলনা থেকে বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করার দাবি করেন এবং বিভিন্ন পন্থায় তদবীর ও প্রচেষ্টা করেন যোগেন্দ্রনাথ। কিন্তু কেন্দ্রীয় বৃটিশ সরকারের আনুকূল্যপ্রাপ্ত স্টীমার (বি.আর.এস.এন) কোম্পানীর প্রবল বাঁধা এবং তদ্বির তদারকীতে বাংলার প্রধানমন্ত্রী প্রভাবিত হওয়ায় যোগেন্দ্রনাথের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার উত্তর পশ্চিম অংশে এবং গৌরনদী থানার দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তের সাতলা ও পাটবাড়ীর বিল অঞ্চলে সরকারীভাবে বাঁধ নির্মাণ করে কৃষকদের ফসলহানী রোধ করার প্রাথমিক পদক্ষেপে যোগেন্দ্রনাথ সফল হওয়ায় আলোচ্য এলাকার কৃষকদের বহুকালের অবহেলিত দাবী পূরণ হয় এবং জনগণ আশাতীত উপকৃত হয়ে আসিতেছেন অদ্যাবধি।  মাহিলাড়া এবং বাঘার গ্রামের বিস্তীর্ণ নিচু বিলের পানি নিষ্কাশনের নিমিত্তে যোগেন্দ্রনাথ ঐ বিলের পূর্ব দিকের বড় খাল পর্যন্ত ১ মাইল দীর্ঘ একটি খাল খনন করে শতশত একর জমি চাষযোগ্য করায় স্থানীয় অধিবাসীগণ অদ্যাবধি উপকৃত হয়ে আসতেছেন।
১৯৪০ সনে কলিকাতা কর্পোরেশন বিল সংশোধনী আইন পাশ হয়। ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা সংশোধনীর পর যুক্ত নির্বাচনে, অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের মধ্য থেকে ৭টি রিজার্ভ সিট সৃষ্টি করে বিল পাশ হয়েছিল। মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল যুক্ত নির্বাচনে কলিকাতা কর্পোরেশনের ৩নং ওয়ার্ড বটতলায় সংরক্ষিত আসন থেকে সর্ব সম্মতভাবে বিশেষ করে দেশ গৌরব সুভাষচন্দ্র বোস এর আনুকূল্যে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং নির্বাচিত ৭০ জন কাউন্সিলদের মধ্যে ভোট প্রাপ্তির সংখ্যায় যোগেন্দ্রনাথ ৪র্থ স্থান অধিকার করেছিলেন এবং তিঁনি কলিকাতা কর্পোরেশনের প্রতিনিধি হিসেবে এক বৎসরের জন্য Bengal Smoke Nuisence Commission এর সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন।
বর্ণ হিন্দু এবং তফসিলী পুলিশ কনেষ্টবলদের একই দালানে বসবাস করার তথাকথিত “অষ্পৃশ্য” সমস্যা সমাধান করার কৃতিত্ব একমাত্র যোগেন্দ্রনাথেরই। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণী হতে তদূর্ধ সকল শ্রেণীর ছাত্রদের জন্য সিডিউল কাস্ট স্টাইপেন্ড প্রদানের ব্যবস্থার কৃতিত্বের একমাত্র দাবীদারও যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলই। স্কুল-কলেজের ছাত্রাবাসে তফসিলি তথা নি¤œবর্ণের ছাত্রদের থাকার জন্য সিট সংরক্ষিত করার এবং সংরক্ষিত সিটের ছাত্রদের হোস্টেল অনুদান দেওয়ার ব্যবস্থা (ঊীপবঢ়ঃরহম ঝঃুঢ়বহফ) যোগেন্দ্রনাথের কৃতিত্ব। সরকারী চাকুরীতে তফসিলী প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করার কাজে বর্ণ হিন্দু এম.এল.এ দের চক্রান্ত প্রতিহত করার কাজে তফসিলী এম.এল.এ দের একত্রিত করে দাবী আদায়ের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিঁনি।
শ্যামা-হক মন্ত্রী সভার পতনের পওে ১৯৪৩ সালের ২৪ এপ্রিল নাজিমুদ্দিন মন্ত্রী সভা গঠন হয়। মন্ত্রী সভায় যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলকে সমবায় ও ঋণদান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৪৩ সালেই বাজেটে তফসিলী জাতির শিক্ষার জন্য পাঁচ লক্ষাধিক টাকা রেকারিং গ্রান্টরূপে বরাদ্দ হয়েছিল। শিক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ এবং চাকুরীতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা যাহা ইতিপূর্বেকার হক-শ্যামা সরকারের সময় বাস্তবায়িত হয় নাই, যোগেন্দ্রনাথের চেষ্টায় নাজিমুদ্দিনের পরিচালনাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বাজেটে বরাদ্দ ও ব্যয় বাস্তবায়িত হয়েছিল।
নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভা ক্ষমতাসীন হওয়ার সাথে সাথে যোগেন্দ্রনাথের চেষ্টায় সাম্প্রদায়িক আনুপাতিক হারে তফসিলী জাতির প্রার্থীগণ সকল বিভাগে চাকুরী পেয়োছিল। Rationing Officer, Lawyear, Magistrate, Judge of small court, Deputy Administrator General, ICS Officer, Deputy Megistrate, Sub-deputy Megistrate, Munsifs, Co-oprative Inspector, Auditor, Setelment Officer, Sub-registrar and Metriculate candidate, Writers Building G clerk পদে চাকুরী পেয়েছিলেন। অনেক Co-operative Inspector and Detconciliation I Subregistrar গণযোগেন্দ্রনাথের চেষ্টায় সাব ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট পদে উন্নীত হয়েছিলেন। যোগেন্দ্রনাথের মন্ত্রীত্বকালে মন্ত্রীসভায় অপ্রতিহত প্রভাবের ফলে সর্বক্ষেত্রে তফসিলী জাতির স্বার্থ পুরাপুরি রক্ষিত হয়েছিল। সরকারের অন্যসব মন্ত্রণালয়ে তফসিলীদের চাকুরী কোটা সঠিকভাবে মান্য করা না হলে সমবায় ও ঋণদান মন্ত্রণালয়ে তফসিলীদের চাকুরী প্রদানের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করা হবে বলে যোগেন্দ্রনাথ ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তফসিলী এম.এল.এ রায় বাহাদুর অনুকূল চন্দ্র দাস ও অন্যান্য তফসিলী এম.এল.এ গণ শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ্য করে এবং কে কি চাকুরী প্রার্থী তাহা নির্দেশ করে তফসিলী প্রার্থীগণের নামের তালিকা প্রস্তুত করে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করিতেন এবং বিনা ইন্টারভিউতেই তাদের নিয়োগপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়োছিল। যোগেন্দ্রনাথ নিজেও এরূপ তালিকা প্রস্তুত করে পাঠাতেন বা সুপারিশ করতেন। যোগেন্দ্রনাথের নামের দোহাইতেও তখন অসম্ভবও সম্ভব হতো। যোগেন্দ্রনাথ ব্যতীত অখন্ড বাংলায় কোন তফসিলী মন্ত্রী এরূপ প্রভাবশালী ছিলেন বলে কোন নজির নাই।
যোগেন্দ্রনাথ সোহরাওয়ার্দী কেবিনেটে মন্ত্রী পদে যোগদান, ভারতের কেন্দ্রীয় অন্তবর্তী মন্ত্রীসভায় আইন মন্ত্রী পদে যোগদান করেছিলেন। ড. বি.আর আম্বেদকরকে সংবিধান প্রণয়নে বলীয়ান করার নিমিত্তে বাংলা প্রদেশের তফসিলী এম.এল.এ দের ভোটে এম.এল.এ নির্বাচিত করা হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনে সভা-সমাবেশ, স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির অপরিহার্যতায় তপসিলী বিশেষ করে পূর্ব বাংলার তপসিলীদের বৃহত্তর কল্যাণের কথা চিন্তা করে যোগেন্দ্রনাথ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের আইন ও শ্রমমন্ত্রী পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এদিকে, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের ১১৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে  গৌরনদীস্থ মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে ২৯ জানুয়ারি তার জন্মভিটায় নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে তার জন্মদিন পালন করা হবে।

এআর/এমআর

বাংলাদেশ সময়: ২২:২৬:৩২ ● ১৪ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ