
মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) থেকে ॥
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর সংকটের মুখে। একসময় জেলার গৌরব হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখন কোচিং বাণিজ্য, অনিয়ম ও শ্রেণিকক্ষ বিমুখতার অভিযোগে কার্যত অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বর্তমানে ক্লাসভেদে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশে।
স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষ এখন আর মূল শিক্ষা কেন্দ্র নয়; বরং কিছু শিক্ষকের প্রাইভেট কোচিং নির্ভর একটি পরোক্ষ বাণিজ্য ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হচ্ছে ক্লাসের পরিবর্তে কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে। ফলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিন চিত্র পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তোলে। ১৫ এপ্রিল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দেখা যায়- দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে ৫৫ জনের মধ্যে উপস্থিত ৯ জন, মানবিক বিভাগে ৯১ জনের মধ্যে ৬ জন, ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল না।
অষ্টম শ্রেণির একটি শাখায় ৬০ জনের মধ্যে ১৬ জন, ষষ্ঠ শ্রেণির একটি শাখায় ৬০ জনে ১৩ জন এবং অন্যটিতে ৮৫ জনে ২৫ জন।
এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি থাকা সত্ত্বেও দৈনিক উপস্থিতি গড়ে এক-চতুর্থাংশেরও নিচে নেমে এসেছে, যা একটি সরকারি মডেল স্কুলের জন্য উদ্বেগজনক চিত্র বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, শ্রেণিকক্ষে পূর্ণাঙ্গ পাঠদান না করে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে যেতে পরোক্ষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়। ফলে ক্লাসে পাঠদান দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে- কোনটি মূল পড়া, আর কোনটি কোচিং নির্ভর প্রস্তুতি।
সরকারি নির্দেশনায় কোচিং বাণিজ্যে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ হলেও, স্থানীয়দের দাবি- এ প্রতিষ্ঠানে সেই নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। এতে শিক্ষার্থীদের একাংশ শ্রেণিকক্ষ থেকে সরে গিয়ে কোচিং সেন্টারকেন্দ্রিক শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
ওই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থপতি মো. ইয়াকুব খান পরিস্থিতিকে ‘শূন্য জবাবদিহিতার ফল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমাদের গর্বের এই প্রতিষ্ঠান আজ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি নিজেই শিক্ষা ব্যবস্থার ভাঙনকে প্রকাশ করছে। অভিভাবকরা বাধ্য হচ্ছেন কোচিং নির্ভরতার ফাঁদে পড়তে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকদের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার পরিবেশ তৈরি না করলে এই সংকট কাটবে না।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম জানান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে তার মতে, কোচিং নির্ভরতা এবং অভিভাবকদের অনীহাই মূল বাধা।
কলাপাড়া উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজর মো. মনিরুজ্জামান খান সাগরকন্যাকে জানান, শিক্ষকদের নিয়মিত মনিটরিংয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং কোচিং চাপের কারণেও উপস্থিতি কমে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ জানান, বিদ্যালয়সহ উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরানো ও শিক্ষার্থী উপস্থিতি বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে- একটি শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ শুধু প্রশাসনিক আশ্বাস আর কোচিং নির্ভরতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। অভিভাবকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ঐতিহ্য শুধু ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।