
এমজিআর নাসির মজুমদার
নগর জীবনের অন্যতম মৌলিক অধিকার হলো নির্বিঘ্নে চলাচল। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে- আমাদের শহরের ফুটপাতগুলো আজ পথচারীদের জন্য নয়, বরং দখলদারিত্বের এক অনিয়ন্ত্রিত চক্রের অংশে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফুটপাত দখলমুক্তকরণ নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ দৃশ্যমান হলেও, প্রশ্ন রয়ে যায়- এই উদ্যোগ কতটা টেকসই?
ফুটপাত দখলের জন্য শুধুমাত্র হকারদের দায়ী করা সহজ, কিন্তু অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা। সমস্যার গভীরে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, যেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক শিথিলতা এবং নিয়মিত চাঁদা আদায়ের একটি অঘোষিত কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ফলে ফুটপাত দখল একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি একটি সংগঠিত ও প্রণোদিত প্রক্রিয়া।
নীতিনির্ধারণের জায়গা থেকে স্পষ্টভাবে বলা দরকার- যদি রাজনৈতিক দলগুলো দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা হকারদের কাছ থেকে কোনো ধরনের চাঁদা গ্রহণ করবে না, তাহলে ফুটপাত দখলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। কারণ তখন অবৈধভাবে ফুটপাতে ব্যবসা পরিচালনার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রণোদনা অনেকটাই হ্রাস পাবে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের দায়িত্ব শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধ নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি, আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। বিচ্ছিন্ন অভিযানের বদলে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিকও বিবেচনায় রাখতে হবে। হকাররা এই শহরের অর্থনীতির একটি বাস্তব অংশ, যারা জীবিকার তাগিদেই ফুটপাতে বসে। তাই তাদের জন্য পরিকল্পিত বিকল্প স্থান, স্বল্পমূল্যের মার্কেট বা নির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি না করে কেবল উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নাও হতে পারে।
একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে হলে ফুটপাতকে অবশ্যই পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত প্রয়াস। অন্যথায়, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ কেবল একটি সাময়িক অভিযান হয়েই থেকে যাবে- স্থায়ী সমাধান কখনোই আসবে না।
লেখক: সিআইপি হিসেবে স্বীকৃত পরিবেশে অবদানের জন্য জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত | এফবিসিসিআই-এর সাবেক পরিচালক।