আস্থা হারালে থমকে যাবে অর্থনীতি: সতর্কবার্তা দেশীয় বিনিয়োগে

হোম » মতামত » আস্থা হারালে থমকে যাবে অর্থনীতি: সতর্কবার্তা দেশীয় বিনিয়োগে
বৃহস্পতিবার ● ১৯ মার্চ ২০২৬


 

আস্থা হারালে থমকে যাবে অর্থনীতি: সতর্কবার্তা দেশীয় বিনিয়োগে

এমজিআর নাসির মজুমদার

বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দারিদ্র্য দূরীকরণ ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য এখন আর কেবল নীতিগত অঙ্গীকার নয়- এটি সময়ের অনিবার্য জাতীয় প্রয়োজন। এই লক্ষ্য অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন ও সুদৃঢ় করা।

 

একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে তার নিজস্ব উদ্যোক্তা শ্রেণির ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণের অস্পষ্টতা, প্রশাসনিক জটিলতা, অপ্রত্যাশিত নীতিপরিবর্তন এবং অনানুষ্ঠানিক বাধার কারণে অনেক দেশীয় বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ সম্প্রসারণে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন। ফলে সম্ভাবনাময় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলো যথাযথভাবে বিকশিত হচ্ছে না।

 

এখানে একটি মৌলিক বিষয় অনুধাবন জরুরি- বিনিয়োগ কেবল মূলধনের বিষয় নয়; এটি আস্থা, নিরাপত্তা ও পূর্বানুমেয় নীতির ওপর নির্ভরশীল। একজন উদ্যোক্তা তখনই নতুন উদ্যোগে এগিয়ে যান, যখন তিনি নিশ্চিত থাকেন যে তার বিনিয়োগ সুরক্ষিত থাকবে এবং নীতিগতভাবে তিনি বৈষম্যের শিকার হবেন না।

 

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে সকল বিনিয়োগকারীর জন্য সমান সুযোগ, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হয়রানি, বৈষম্য বা প্রভাবশালীদের অগ্রাধিকার শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষতি করে না, বরং তা সামগ্রিক অর্থনীতির গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

 

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের অবস্থা একটি নির্ধারক সূচক হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই পর্যবেক্ষণ করেন- স্থানীয় উদ্যোক্তারা কতটা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, আইনের শাসন কতটা কার্যকর, এবং রাষ্ট্রের আচরণ কতটা নিরপেক্ষ। দেশীয় বিনিয়োগকারীরা যদি আস্থাহীনতায় ভোগেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনাও স্বাভাবিকভাবেই ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

 

বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ডিজিটাল খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন এই অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা- যেখানে নীতি হবে স্থিতিশীল, প্রশাসন হবে সহায়ক এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত থাকবে।

 

দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো শক্তিশালী বেসরকারি খাতের বিকাশ। আর এই বিকাশ তখনই সম্ভব, যখন দেশীয় বিনিয়োগকারীরা নিজেদের দেশে বিনিয়োগ করতে আত্মবিশ্বাসী হবেন, সম্মানবোধ করবেন এবং নিরাপত্তা অনুভব করবেন।

 

অতএব, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার এখনই সময়। দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতে পারে একটি টেকসই ও শক্তিশালী অর্থনীতি- যার ওপর ভর করেই বাংলাদেশ হতে পারে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিনিয়োগের একটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্য।

 

লেখক: সাবেক পরিচালক, এফবিসিসিআই

বাংলাদেশ সময়: ১১:০১:৪৯ ● ৯১ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ