মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র নয়, সুন্দরবনের জলপথে শরণার্থী পার করতেন মানিক পশারী

হোম » মুক্তিযুদ্ধ » মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র নয়, সুন্দরবনের জলপথে শরণার্থী পার করতেন মানিক পশারী
শুক্রবার ● ৩০ অক্টোবর ২০২৬


 

মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র নয়, সুন্দরবনের জলপথে শরণার্থী পার করতেন মানিক পশারী

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরিশাল

 

একদিকে সুন্দরবনের দুর্গম জলপথ, অন্যদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর নজরদারি। মাঝখানে নদী-খাল পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার অপেক্ষায় শরণার্থী ও প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী তরুণেরা। মুক্তিযুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে নৌকায় করে তাঁদের নিরাপদে সীমান্তের ওপারে পৌঁছে দিতেন মানিক পশারী। অস্ত্র হাতে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ না নিলেও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল সহযোগী হিসেবে।

 

পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক আহমেদ শহিদুল হক এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁর বড় ভাই শহীদ ফজলুল হক খোকন প্রথম মানিক পশারী ও তাঁর চাচা রেয়াজ উদ্দিন পশারীকে এ কাজে নিয়োগ দেন। পরে সুন্দরবন এলাকায় অবস্থানকালে সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনও তাঁদের নিজের অধীনে কাজ করার অনুরোধ করেন।

 

আহমেদ শহিদুল হক বলেন, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌকা চালিয়ে শরণার্থী ও প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক তরুণদের ভারতে নিয়ে যেতেন মানিক পশারী।

 

এই ভূমিকার কারণে তাঁকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮০ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম তালিকা তৈরির সময় আহমেদ শহিদুল হক পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন মহকুমা ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় তিনি মানিক পশারীকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে সহায়তা করেন।

 

পরে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার পৃথক শ্রেণি বিলুপ্ত হলে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়।

 

তবে সম্প্রতি তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী পিরোজপুর জেলা শাখা, পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ বলে দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

 

এই বিতর্কের মধ্যেই মানিক পশারীর মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার দিন গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে মাসুদ সাঈদী বলেন, মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না। আপত্তি ছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে।

 

মাসুদ সাঈদী জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য এবং মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে। তাঁর দাবি, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। জনতার আপত্তি সত্ত্বেও প্রশাসন তাঁকে গার্ড অব অনার দিয়েছে। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মানিক পশারী নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি; মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন।

 

পোস্টে তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের দেওয়া একটি ডিও লেটারের কথাও উল্লেখ করেন মাসুদ সাঈদী। তাঁর দাবি, ওই চিঠির ভিত্তিতেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় মানিক পশারীর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কর্মকর্তা ও যাচাই-বাছাই কমিটির ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান তিনি।

 

এদিকে মানিক পশারীর গার্ড অব অনার ও দাফনে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার মানববন্ধন করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। পিরোজপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সামনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর সদর উপজেলা কমান্ড এ কর্মসূচির আয়োজন করে।

 

মানববন্ধনে আহমেদ শহিদুল হক বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ পিরোজপুরে পৌঁছানোর দিন তাঁরা পুষ্পস্তবক নিয়ে সদর উপজেলা পরিষদে যান। এ সময় একদল লোক তাঁর কাছ থেকে পুষ্পস্তবক ছিনিয়ে নিয়ে বাইরে ফেলে দেয়। এ ঘটনার পর তাঁরা কর্মসূচি বাতিল করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই রাতে দাফনেও যাননি মুক্তিযোদ্ধারা।

 

আহমেদ শহিদুল হক আরও বলেন, মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক ছড়ানো ঠিক নয়। তথ্যপ্রমাণসহ জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আবেদন করা উচিত।

বাংলাদেশ সময়: ২৩:০২:০১ ● ২২ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ