
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের বিএফডিসি মার্কেটে সরকারি বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অটোভ্যান চার্জিং ও সাবমিটার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। মার্কেটের ম্যানেজার শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে এসব খাত থেকে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আদায় এবং ওই অর্থের যথাযথ হিসাব না রাখার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি। তবে অভিযোগের বিষয়ে ম্যানেজার অটোভ্যান চার্জ দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও অর্থ সরকারি খাতে জমা হয় কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেননি।
অভিযোগ রয়েছে, বিএফডিসি অফিসের সরকারি মিটার থেকে সংযোগ নিয়ে দিন-রাত অটোভ্যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি অটোভ্যানের কাছ থেকে মাসে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মাছ পরিবহনে ব্যবহৃত ৬০ থেকে ৭০টি অটোভ্যান নিয়মিত সেখানে চার্জ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিএফডিসি মার্কেটে প্রায় অর্ধশত মাছের আড়ত রয়েছে। প্রতিটি আড়তে সাবমিটার স্থাপন করা হয়েছে। এসব সাবমিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ বিল আদায় করা হলেও আদায়কৃত অর্থের হিসাব ও সরকারি রাজস্ব খাতে জমার বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিএফডিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট মাসে বিএফডিসি মার্কেটের বিদ্যুৎ বিল এসেছে প্রায় ১৬ হাজার টাকা। অথচ অটোভ্যান চার্জিং ও সাবমিটার থেকে মাসে প্রায় এক লাখ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না এবং যথাযথ হিসাবও রাখা হয় না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে সরেজমিনে গিয়ে বিএফডিসি মার্কেটে ৩৫ থেকে ৪০টি অটোভ্যান চার্জ দিতে দেখা যায়। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলেও সেখানে ১৫ থেকে ২০টি অটোভ্যান চার্জে থাকতে দেখা গেছে।
মার্কেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে মাছ আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত অটোভ্যানগুলো দিন-রাত সেখানে চার্জ দেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ, চার্জের টাকা সরকারি রাজস্ব খাতে জমা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিএফডিসি মার্কেটের ম্যানেজার শরিফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি অটোভ্যান চার্জ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের অনুরোধে অটোভ্যান চার্জ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এ থেকে আদায় করা টাকা সরকারি খাতে জমা হয় কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি। তিনি এ বিষয়ে লিখিত বা নথিভিত্তিক বক্তব্য দিতেও রাজি হননি।
এ সময় বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য মার্কেটের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের তাঁর কার্যালয়ে ডেকে আনা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে বিএফডিসি মার্কেটের শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি সালাউদ্দিন, লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সুলতান মুসুল্লি, লতাচাপলী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক দলের মহিপুর থানার সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান মিলন, আলীপুর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, ট্রলিং বোট ব্যবসায়ী আবুল হোসেন কাজীসহ কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে উপস্থিত অনেকেই এতে সাড়া দেননি।
এ সময় লতাচাপলী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ সুলতান মুসুল্লি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ম্যানেজার অটোভ্যান চার্জ দিয়ে সরকারি বিল দিয়ে যা থাকে, তাতে ওনার পকেট খরচ চলে। তাতে আপনাদের কী?’
এ ছাড়া সাংবাদিকদের কাছে তিনি প্রশ্ন করেন, ম্যানেজারের সঙ্গে কথা না বলে সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা যাবে কি না। এ সময় কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি মিজানুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, অটোভ্যান চার্জিং, সাবমিটারসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় ম্যানেজার শরিফুল ইসলাম পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ভোরের কাগজের কুয়াকাটা প্রতিনিধি ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন আনুকে হেনস্তার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন।
এদিকে বিএফডিসি মার্কেটের একাধিক সূত্রের দাবি, সেখানে থাকা মাছের আড়তগুলোতে গভীর সমুদ্র থেকে ধরা বিপুল পরিমাণ মাছ বিক্রি হলেও এসব মাছের রাজস্ব আদায়ের হিসাব নিয়েও অসংগতি রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বড় পরিমাণ মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রকৃত বিক্রয়মূল্য অনুযায়ী রাজস্ব দেখানো হয় না। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে আলীপুর বিএফডিসি মার্কেট ও মহিপুরের মাছের আড়তগুলোতে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত হিসাব প্রকাশ এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এ বিষয়ে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম সম্রাট খান বলেন, বিএফডিসি মার্কেটে অবৈধভাবে অটোভ্যান চার্জ দেওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন। এমনটি হয়ে থাকলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে।