পবিপ্রবি’র উদ্যোগ অবহেলিত সামুদ্রিক শৈবাল এবার হতে পারে অর্থনীতির হাতিয়ার

হোম » লিড নিউজ » পবিপ্রবি’র উদ্যোগ অবহেলিত সামুদ্রিক শৈবাল এবার হতে পারে অর্থনীতির হাতিয়ার
মঙ্গলবার ● ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

সী উইড চাষে উপকূলে অমিত সম্ভাবনার হাতছানি

কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী থেকে

 

উপকূলে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নীল অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে সী উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল চাষ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি প্রাণিজ ও প্রচলিত উদ্ভিজ্জ খাদ্যের ওপর চাপ কমাতে সামুদ্রিক শৈবালভিত্তিক খাদ্য ও বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।

 

বিশ্ববিদ্যালয়টির মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কাজ করছেন। শৈবাল থেকে বিভিন্ন খাদ্য ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরিতেও তারা সফল হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

 

পবিপ্রবি ফিসারিজ ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থীরা জানান, সাগরে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো সী উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল প্রক্রিয়াজাত করে আইসক্রিম, মিষ্টি, জিলাপি, বিস্কুট, সন্দেশ, জেলিসহ বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা যায়। জাপানের জনপ্রিয় খাবার সুশির অন্যতম উপকরণ নোরি শিটও সামুদ্রিক শৈবাল থেকে তৈরি হয়।

সী উইড চাষে উপকূলে অমিত সম্ভাবনার হাতছানি

 

এ ছাড়া শৈবাল ব্যবহার করে খাদ্য সম্পূরক ট্যাবলেট, সাবান, উবটানসহ বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী তৈরি করা হচ্ছে। সামুদ্রিক শৈবালে ফাইবার, প্রোটিন, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ওমেগা-৩ এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ত্বক ও চুলের যত্নেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

 

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য অণুজীববিজ্ঞান ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহজাদুল ইসলাম বলেন, ‘শৈবালে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে। এর মধ্যে প্রোটিন অন্যতম। আমরা সাধারণত প্রোটিনের জন্য গরুর মাংসের ওপর বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু বিকল্প উৎস হিসেবে শৈবাল থেকে প্রোটিন গ্রহণ করা গেলে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব। এতে আয়োডিনও রয়েছে, যা আয়োডিনের ঘাটতিজনিত সমস্যা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।’

 

দুমকি লুথ্যারন হেলথ কেয়ারের মেডিকেল অফিসার ডা. মোন্তারিয়া জান্নাত বলেন, ‘সামুদ্রিক শৈবালে এমন কিছু ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য উপকারী।’

 

পবিপ্রবি মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলম বলেন, ‘পটুয়াখালী সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা হওয়ায় এখানে সামুদ্রিক শৈবাল সহজলভ্য। এ কারণে পটুয়াখালীতে প্রথমবারের মতো এর চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সহজলভ্য হওয়ায় উৎপাদন খরচও তুলনামূলক কম। শৈবালে প্রচুর পুষ্টিগুণ থাকায় এটি থেকে বিকল্প খাদ্য হিসেবে নানা ধরনের পণ্য তৈরি করা সম্ভব।’

 

একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সী উইড অনেকটাই অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল। সামুদ্রিক শৈবালকে সামুদ্রিক সবজি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। প্রচলিত অনেক সবজির তুলনায় এতে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে। এর পুষ্টি উপাদান শরীরে সহজে শোষিত হওয়ায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।’

সী উইড চাষে উপকূলে অমিত সম্ভাবনার হাতছানি

 

পবিপ্রবি উপাচার্য প্রফেসর ড. হেমায়েত জাহান বলেন, ‘সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামুদ্রিক শৈবাল বা সী উইডের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় চাষ সম্প্রসারণ এবং উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বিপণনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের উপকূলীয় এলাকায় এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া গেলে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিতভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের নীল অর্থনীতিও আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৫:০৯:৪৭ ● ৩২ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ