মতভেদ হোক, শত্রুতা নয়: ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে ইসলামের শিক্ষা

হোম » ইসলামী জীবন » মতভেদ হোক, শত্রুতা নয়: ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে ইসলামের শিক্ষা
শুক্রবার ● ২৮ আগস্ট ২০২৬


 

ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে রাসুল (সা.) যেমন আচরণ করতেন

সাগরকন্যা ইসলামী ডেস্ক

 

মতপার্থক্য মানবজীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ কিংবা একই আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যেও চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্তে ভিন্নতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। ইসলাম মানুষের এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করেনি। বরং মতভেদের পরিস্থিতিতে কীভাবে ন্যায়, শালীনতা, সংযম ও প্রজ্ঞা বজায় রাখতে হবে, কোরআন ও সুন্নাহতে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

 

বর্তমান সময়ে মতভিন্নতা অনেক ক্ষেত্রেই অসহিষ্ণুতায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত প্রকাশ করলেই অনেকে অপমান, বিদ্রুপ, কটূক্তি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হন। কখনো ধর্মীয় কোনো বিষয়ে মতপার্থক্যও এমন তিক্ততায় পৌঁছায় যে, একজন মুসলিম আরেক মুসলিমের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন করে ফেলেন।

 

অথচ মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে আচরণের এক অনন্য আদর্শ। সত্যের বিষয়ে তিনি ছিলেন আপসহীন, কিন্তু সত্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও সংযত। তিনি ভুলকে ভুল বলেছেন, তবে ভুলকারীকে সংশোধনের সুযোগ দিয়েছেন। বিরোধীদের সঙ্গে যুক্তি ও দলিলের ভিত্তিতে কথা বলেছেন, কিন্তু অশালীন ভাষা ব্যবহার করেননি।

 

কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কোরো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক কোরো সর্বোত্তম পন্থায়।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

 

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম শুধু সত্য বলার নির্দেশ দেয়নি; বরং সত্য কীভাবে উপস্থাপন করতে হবে, সেটিও শিখিয়েছে। যুক্তি ও দলিলের পাশাপাশি থাকতে হবে হিকমত, কোমলতা, উত্তম উপদেশ ও সুন্দর আচরণ।

 

ন্যায়বিচার থেকে যেন মতভেদ বিরত না রাখে

 

মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ন্যায়বিচার। কারো সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত মতের অমিল থাকলেও তার অধিকার নষ্ট করা যাবে না।

 

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার কোরো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)

 

অর্থাৎ কারো প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হলেও তার প্রতি অন্যায় করার সুযোগ নেই। ন্যায়বিচার কোনো ব্যক্তি, দল বা সম্প্রদায়ের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; এটি একজন মুমিনের নীতিগত দায়িত্ব।

 

মহানবী (সা.)-এর জীবনে অমুসলিমদের সঙ্গে লেনদেন, চুক্তি, প্রতিবেশীসুলভ আচরণ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও মানবিক ও সামাজিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব- নববী জীবন থেকে এ শিক্ষাই পাওয়া যায়।

 

বিতর্কেও থাকতে হবে শালীনতা

 

মহানবী (সা.)-এর কাছে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ প্রশ্ন নিয়ে এসেছে, আপত্তি জানিয়েছে এবং কখনো কঠোর ভাষায় কথাও বলেছে। তিনি পরিস্থিতি, ব্যক্তির অবস্থা ও প্রশ্নের ধরন বিবেচনা করে উত্তর দিয়েছেন। এটাই ছিল তাঁর হিকমত।

 

আহলে কিতাবের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও কোরআনে সর্বোত্তম পদ্ধতি অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আহলে কিতাবের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থা ছাড়া বিতর্ক কোরো না।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৬)

 

এমনকি ফেরাউনের মতো জালিম শাসকের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সময়ও হজরত মুসা (আ.) ও হজরত হারুন (আ.)-কে কোমল ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বোলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৪৪)

 

ফেরাউনের মতো ব্যক্তির সঙ্গেও যদি ভাষার সৌন্দর্য ও কোমলতা বজায় রাখার নির্দেশ থাকে, তাহলে সাধারণ মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের ভাষা ও আচরণ কতটা সংযত হওয়া উচিত, তা সহজেই অনুমান করা যায়। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/৫৪২; মাআরিফুল কোরআন : ৬/৭০২)

 

তবে কোমলতা মানে অন্যায় ও জুলুমের কাছে আত্মসমর্পণ নয়। যেখানে সীমালঙ্ঘন ও অন্যায় রয়েছে, সেখানে ইসলাম ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে নিজের আকিদা ও নীতির ক্ষেত্রেও আপস করার শিক্ষা দেয়নি।

 

অন্যের আচরণ যেন নিজের চরিত্র নির্ধারণ না করে

 

মহানবী (সা.) কঠোর স্বভাবের মানুষের সঙ্গেও শালীনতা বজায় রাখতেন। কেউ তাঁকে অপমান করলেও তিনি পাল্টা অপমান করতেন না।

 

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, ‘তাকে অনুমতি দাও; সে তার গোত্রের কতই না নিকৃষ্ট সন্তান, অথবা গোত্রের নিকৃষ্ট ব্যক্তি।’

 

লোকটি প্রবেশ করার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলেন। পরে আয়েশা (রা.) এ বিষয়ে জানতে চাইলে নবীজি (সা.) ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক থেকে নিকৃষ্ট মানুষের মধ্যে সেও রয়েছে, যার অশালীন আচরণ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তাকে পরিত্যাগ করে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০৫৪)

 

আরেক বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘হে আয়েশা! ধীর হও, কোমলতা অবলম্বন কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২৫৬)

 

এই ঘটনাগুলো থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। অন্যের আচরণ যেমনই হোক, তা যেন নিজের চরিত্র ও নৈতিকতার মানদণ্ড হয়ে না যায়। কাউকে অপছন্দ করা এক বিষয়, আর তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই শিক্ষা আরও জরুরি

 

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন মানুষ মুহূর্তেই নিজের বক্তব্য অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে গুজব, অর্ধসত্য, বিদ্রুপ, অপমান এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতাও।

 

কেউ একটি মত প্রকাশ করলেন, আর তার নিচে শুরু হলো কটূক্তি। কেউ কঠোর ভাষায় মন্তব্য করলেন, জবাবে আরও কঠিন ভাষায় আক্রমণ করা হলো। এভাবে সামান্য মতভেদও ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত হয়।

 

অথচ মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা হলো, অন্যের ভাষা আমাদের চরিত্র নির্ধারণ করবে না। কেউ অন্যায় ভাষা ব্যবহার করলেও একজন মুসলিমকে নিজের সংযম ও নৈতিকতা ধরে রাখতে হবে।

 

কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অন্যকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

 

আরও বলা হয়েছে, ‘তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গিবত কোরো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)

 

তাই মতভেদ দেখা দিলে প্রথম দায়িত্ব হলো- তথ্য যাচাই করা, অপরের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করা এবং অযথা অপমানজনক ভাষা থেকে বিরত থাকা। মতের বিরোধিতা করা যেতে পারে, যুক্তি দিয়ে বক্তব্যের ভুল ধরিয়ে দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু ব্যক্তিকে অপমান করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানো ইসলামের আদর্শ নয়।

 

মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু সেই মতভেদ যেন সম্পর্কের শত্রুতায় পরিণত না হয়। সত্যের পক্ষে দৃঢ় থাকা এবং একই সঙ্গে ভিন্নমতের মানুষের প্রতি ন্যায়, সংযম ও সৌজন্য বজায় রাখাই ইসলামের সুন্দর শিক্ষা।

 

আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক জ্ঞান দান করুন, মতভেদের ক্ষেত্রে হিকমত ও সংযম অবলম্বনের তাওফিক দিন এবং পরস্পরের প্রতি ন্যায় ও সুন্দর আচরণ করার সামর্থ্য দান করুন। আমিন।

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫২:০০ ● ২৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ