
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা
বরগুনার বামনা উপজেলার সোনাখালীতে রাস্তার পাশে প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগের ভেতর থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া সেই নবজাতক কন্যাশিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বরিশালের আগৈলঝাড়া ছোটমনি নিবাস থেকে উন্নত অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাকে ঢাকা মাতৃসদন শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে সেখানে শিশুটির চিকিৎসা চলছে এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বুধবার (২৬ আগস্ট) শিশুটিকে বামনা থেকে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ছোটমনি নিবাসে নেওয়া হয়। সেখানে তার প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়। পরে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর থেকে জীবিত নবজাতক উদ্ধারের খবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানতে পারেন। এরপর তাঁর নির্দেশনায় বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় শিশুটিকে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদকে শিশুটিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে শিশুটির শারীরিক অবস্থা ভালো ও স্থিতিশীল রয়েছে বলে বিভাগীয় কমিশনার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করেন। পরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের পরিবর্তে উন্নত অ্যাম্বুলেন্সে সড়কপথে শিশুটিকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এর আগে ২৪ আগস্ট বামনার সোনাখালী এলাকায় রাস্তার পাশে একটি প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগের ভেতর থেকে জীবিত অবস্থায় নবজাতকটিকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় শিশুটির শরীরে পিঁপড়া ছিল এবং নাড়িও পুরোপুরি কাটা হয়নি বলে জানা যায়। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য বামনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
শিশুটিকে উদ্ধারের পর তারিফ হাওলাদার ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তিন দিন ধরে নিজেদের সন্তানের মতো করে আগলে রাখেন। শিশুটিকে কোলে নেওয়া, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানোসহ প্রয়োজনীয় যত্ন নেন তাঁরা।
মাত্র তিন দিনের এই সম্পর্কেই শিশুটির প্রতি গভীর মায়া তৈরি হয় মাসুমা বেগমের। বুধবার শিশুটিকে সরকারি তত্ত্বাবধানে নেওয়ার জন্য কর্মকর্তারা হাসপাতালে গেলে তিনি শিশুটিকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে শিশুটিকে দিতে না চেয়ে তিনি আপত্তি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী দুলাল জানান, সরকারি কর্মকর্তা, নারী পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শিশুটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে সরকারি তত্ত্বাবধানে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর চেষ্টা করেন। পরে বিভিন্ন আশ্বাসের পর মাসুমা বেগম শিশুটিকে কোলে নিয়েই অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন। এ সময় হাসপাতাল চত্বরে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উপস্থিত অনেককেই চোখের পানি মুছতে দেখা যায়।
মাসুমা বেগম বলেন, ‘শিশুটি আমার। আমি দেব না। মা এতদিন কই ছিল? আমি তো তিন দিন মায়ের মতো করে লালন করলাম। তখন তো কেউ নিতে আসেনি। এখন সবাই এসেছে।’
এদিকে শিশুটির প্রয়োজনীয় যত্ন ও নিরাপত্তার বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখছে স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. নিকহাত আরা ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. মাহমুল হাসিব নবজাতকটির জন্য পাঁচ সেট পোশাক, দুটি তোয়ালে, একটি বিছানাসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা করেন।
শিশুটির সরকারি তত্ত্বাবধান, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়টি এখন প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় চিকিৎসাধীন শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও তার উন্নত চিকিৎসা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্টদের প্রধান লক্ষ্য।