
নাসির উদ্দিন বিপ্লব
কুয়াকাটা, মহিপুর, কলাপাড়া ও আশপাশের এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য নিয়ে কিশোর ও যুবকদের আটকের খবর আসছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রতিদিন একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে- শুধু মাদকসহ মানুষ আটক করলেই কি মাদক কমবে?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর ও তরুণদের উপস্থিতি দেখা যায়। যে বয়সে একজন তরুণের হাতে থাকার কথা বই, খেলাধুলার সরঞ্জাম কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন, সেই বয়সেই কারও হাতে যদি মাদক উঠে আসে, তাহলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ ও আমাদের সামগ্রিক পরিবেশ।
মাদকাসক্তি এক দিনে তৈরি হয় না। অনেক সময় কৌতূহল থেকে শুরু হয়। বন্ধুর প্ররোচনা, আড্ডা, হতাশা, বেকারত্ব কিংবা পরিবারের অবহেলা একজন তরুণকে ধীরে ধীরে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। প্রথমে ‘একবার চেষ্টা’ কিংবা ‘বন্ধুদের সঙ্গে একটু’ দিয়ে শুরু হলেও একসময় সেটিই হয়ে উঠতে পারে জীবনের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি।
আবার মাদক কেবল ব্যক্তিজীবন নষ্ট করে থেমে থাকে না। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে চুরি, ছিনতাই, মারামারি, কিশোর গ্যাং, পারিবারিক সহিংসতা ও নানা ধরনের অপরাধ। ফলে একজন কিশোরের মাদক গ্রহণকে শুধু তার ব্যক্তিগত পছন্দ বা ভুল হিসেবে দেখলে সমস্যাটির বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়।
তবে এখানেই আরেকটি মানবিক প্রশ্ন আছে। মাদকসহ আটক হওয়া প্রতিটি কিশোর বা তরুণ কি কেবল ‘অপরাধী’? আইন তার নিজস্ব পথে চলবে, অপরাধ করলে আইনি ব্যবস্থা নিতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে- এই তরুণটি মাদকের কাছে গেল কেন?
কেউ হয়তো মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। কেউ হয়তো নিজেই আসক্ত। আবার কেউ হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে প্রথমবারের মতো মাদকের সংস্পর্শে এসেছে। সবার জন্য একই ধরনের প্রতিকার কার্যকর হবে না। অপরাধের সঙ্গে আপস নয়, কিন্তু পুনর্বাসনের পথও বন্ধ করা যাবে না।
বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসছে কিনা কিংবা রাতের আড্ডা কোথায় হচ্ছে- এসব জানার পাশাপাশি তার সঙ্গে কথা বলার পরিবেশও তৈরি করতে হবে। শুধু শাসন নয়, সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। অনেক সময় একটি পরিবারের আন্তরিক নজরদারি একজন কিশোরকে মাদকের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
সমাজেরও দায়িত্ব আছে। কোনো এলাকায় মাদক বিক্রি হচ্ছে- এমন তথ্য জানার পর আমরা যদি নীরব থাকি, তাহলে সমস্যাটিকে প্রশ্রয়ই দেওয়া হয়। মাদক কারবারির পরিচয় প্রভাবশালী হোক কিংবা সাধারণ, তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রভাব যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
প্রশাসনের অভিযান তাই অব্যাহত থাকতেই হবে। তবে অভিযান যেন কেবল ‘আটকের সংখ্যা’ দিয়ে সফলতার মাপকাঠি না হয়। একই সঙ্গে দেখতে হবে- মাদক কোথা থেকে আসছে, কারা সরবরাহ করছে, কারা তরুণদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এবং কেন নতুন নতুন কিশোর এই চক্রে ঢুকে পড়ছে।
কুয়াকাটা পর্যটননির্ভর এলাকা। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের আসা-যাওয়া রয়েছে। ফলে মাদক নিয়ন্ত্রণ শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি এলাকার সামাজিক পরিবেশ, পর্যটন, তরুণ প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
একজন কিশোরকে মাদক থেকে দূরে রাখতে শুধু পুলিশের একটি অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রয়োজন খেলাধুলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগার, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।
কারণ মাদকবিরোধী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় সাফল্য কতজনকে আটক করা হলো, সেটি নয়; কতজন তরুণকে মাদকের কাছে যাওয়ার আগেই ফিরিয়ে আনা গেল, সেটিই আসল সাফল্য।
আজ যে কিশোরটি মাদকসহ আটক হয়েছে, তাকে শুধুই একটি মামলার আসামি হিসেবে দেখলে হয়তো একটি দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলানো যাবে। কিন্তু তাকে যদি একজন বিপথগামী মানুষ হিসেবে দেখে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে বাঁচতে পারে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ, এমনকি একটি প্রজন্ম।
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে। কিন্তু কিশোরদের জন্য হতে হবে আরও বেশি সচেতন, মানবিক ও দায়িত্বশীল। কারণ মাদককে হারাতে হলে শুধু মাদক কারবারিকে ধরলেই হবে না, মাদকের দিকে এগিয়ে যাওয়া প্রজন্মটির হাতও সময় থাকতে ধরে রাখতে হবে।
লেখক: কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি