সাগরকন্যা প্রতিবেদক
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া ও বাস্তবায়নাধীন একাধিক মেগা প্রকল্প এখন নতুন সরকারের জন্য বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিমূল্যায়ন, ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা, ঋণনির্ভরতা এবং কিছু প্রকল্পের প্রত্যাশিত ব্যবহার না হওয়ায় এসব প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কয়েকটি প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল ইতোমধ্যে দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিপরীতে কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্পে যান চলাচল প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। আবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় পূর্ণ সুফল মিলছে না। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের কয়েকটি প্রকল্পেও ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির চাপ রয়েছে।
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আটটি প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ‘ফাস্ট ট্র্যাক মেগা প্রজেক্ট’ হিসেবে অগ্রাধিকার দেয়। এর মধ্যে ছিল পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পদ্মা সেতু রেলসংযোগ এবং দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি প্রকল্পকে রূপান্তরমূলক মেগা প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পদ্মা সেতুর সুফল, রেলসংযোগে প্রশ্ন
২০২২ সালের জুনে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। বর্তমানে সড়ক ও রেল - দুই পথেই সেতুটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার নতুন ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটির দৈনিক ২৪টি ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে চলছে মাত্র আটটি। জনবল, লোকোমোটিভ ও কোচের ঘাটতির পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল বৈদেশিক ঋণনির্ভর এই প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করাই যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের আয় বাড়াতে এর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো জরুরি।
মেট্রোরেলে অগ্রগতি, বাড়ছে ব্যবহার
ঢাকা মেট্রোরেল এমআরটি-৬-এর উত্তরা-মতিঝিল অংশ চালুর পর এর ব্যবহার বেড়েছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশের নির্মাণকাজও চলছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির সামগ্রিক অগ্রগতি ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৮১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
এ ছাড়া এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫-এর কাজও এগিয়েছে। অর্থাৎ এই খাতের কয়েকটি প্রকল্প নির্মাণ ব্যয় ও সময়ের চাপ থাকলেও নগর পরিবহনে বাস্তব সুবিধা তৈরি করছে।
রূপপুরে অগ্রগতি, বিদ্যুৎ পেতে অপেক্ষা
দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। দুই ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল প্রায় ৬৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিংয়ের কাজও শুরু হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি নির্মাণপর্ব পেরিয়ে উৎপাদনের প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। তবে উৎপাদনে যাওয়ার সময় বারবার পিছিয়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত সুফল পেতে অপেক্ষা বাড়ছে।
কর্ণফুলী টানেলে প্রত্যাশার চেয়ে কম যানবাহন
প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল সরকারের জন্য অন্যতম বড় আর্থিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। নির্মাণের আগে সমীক্ষায় প্রতিদিন ২৮ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বর্তমানে দৈনিক যান চলাচল প্রায় ৪ হাজার।
ফলে টোল থেকে প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না। নির্মাণ ব্যয় বর্তমান হারে টোল আদায়ের মাধ্যমে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রভাব মূল্যায়নেও প্রকল্পটির আর্থিক ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ব্যয় ও সময়ের চাপ
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর-ফার্মগেট অংশ চালু হলেও পুরো প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি। ফলে আংশিক সুবিধা পাওয়া গেলেও রাজধানীর যানজট নিরসনে এর পূর্ণ সুফল মিলছে না।
অন্যদিকে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজেও সময় ও ব্যয় বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। সংশোধিত ব্যয় প্রায় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো এবং ব্যয় সংশোধনের ফলে সরকারি অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালে উদ্বোধন হলেও পূর্ণ সুবিধা মেলেনি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালও নির্ধারিত কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই উদ্বোধন করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
ফলে উদ্বোধনের পরও টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। নির্মাণকাজ শেষ করার পাশাপাশি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা চূড়ান্ত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ ও গভীর সমুদ্রবন্দরে ধীরগতি
মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিটের বিদ্যুৎ প্রকল্পের অগ্রগতি ২০২৪ সালের জুনের ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। সংশোধিত ব্যয় প্রায় ৫৬ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা।
তবে প্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একই এলাকার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের অগ্রগতি আরও ধীর। ২০২৪ সালের জুনে এর অগ্রগতি ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় প্রায় ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা এবং শেষ করার সময়সীমা ২০২৯ সাল।
রামপাল ও পায়রা উৎপাদনে, তবে জ্বালানি সংকটের চাপ
রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে। তবে কয়লা আমদানি, ডলারসংকট ও অর্থায়ন সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৯টি উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি। একই সময়ে ১ হাজার ১১টি প্রকল্পে অগ্রগতি ছিল ২৫ শতাংশের নিচে। এতে শুধু মেগা প্রকল্প নয়, সামগ্রিক প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নতুন সরকারের সামনে দুটি বড় প্রশ্ন
সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর বড় অংশ এখন নতুন সরকারের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে অসমাপ্ত প্রকল্প শেষ করতে আরও অর্থ ব্যয় করতে হবে, অন্যদিকে নির্মাণ শেষে সেগুলো থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতিমূল্যায়িত প্রকল্প মানেই সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি। বিগত সরকারের নেওয়া এসব প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাওয়াই আমাদের জন্য এক ধরনের চাপ। আর্থিক খাতের ভঙ্গুর পরিস্থিতি রাতারাতি ঠিক করা সম্ভব নয়।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আগের সরকারের সময়ে অনেক মেগা প্রকল্পই অতিমূল্যায়িত ছিল। শুধু তাই নয়, অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও ছিল। আবার কিছু প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক সুফল নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
ফলে এখন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন হলো - কোন প্রকল্প দ্রুত শেষ করা হবে, কোনটির ব্যয় কমানো সম্ভব এবং কোন প্রকল্প থেকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে। বিশেষ করে কম ব্যবহার হওয়া কর্ণফুলী টানেল এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে আয়, পরিচালন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে বড় পরীক্ষা।