
সাগরকন্যা প্রবাস ডেস্ক
লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকা বিকল হয়ে খাবার ও পানির সংকটে অন্তত ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার কারণে মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বেঁচে থাকা যাত্রীরা সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন। এ ঘটনায় আরও ১৮ বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করে মিসরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সাগরকন্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ ঘটনার প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। নতুন তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন সুদানি নাগরিক ছিলেন।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পর নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাত্রা চালিয়ে যেতে থাকেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।
গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর নৌকার ইঞ্জিন হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। এতে সাগরের মাঝখানে নৌকাটি ভাসতে থাকে। খাবার ও পানির সংকটে একের পর এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে তাঁদের কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছায়। পরে মিসরের নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) উপকূল থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা মিসরের পুলিশ ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, খাবার ও পানির অভাবে তাঁদের চোখের সামনেই একের পর এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। পরে মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা।
মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল হেকিমের ছেলে আবদুল করিম বলেন, গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। এরপর নৌকাটি আর সামনে এগোতে পারেনি।
আবদুল করিম বলেন, নৌকায় খাবার বা পানি কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনে কয়েকজন বাংলাদেশি মারা যান। পরে তাঁদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে বেঁচে থাকা অনেকের শরীরেও পচন ধরেছে।
আবদুল করিম দেশে ফিরে যেতে চান। তবে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পরিকল্পনার কথা তাঁর পরিবার জানত না। তাঁর মা আকলিমা বেগম জানান, তাঁর ছেলে আগে সৌদি আরবে থাকতেন। সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পরিকল্পনার কথা তিনি পরিবারকে জানাননি।
করিমের মামা ও পাথারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুর রাজ্জাকও জানান, করিমের সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার বিষয়টি তাঁরা আগে জানতেন না।
মিসরের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে পুলিশ তখনও নিশ্চিত হতে পারেনি।
এদিকে মিসরে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতাল ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তাঁদের চিকিৎসার অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে দূতাবাস।
আহত বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শেষে আটক বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছে দূতাবাস।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় বাংলাদেশিদের প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। উন্নত জীবনের আশায় দালালদের মাধ্যমে অনিরাপদ নৌযানে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছরই অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারান। খাবার-পানি সংকট, নৌযানের ত্রুটি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার মতো পরিস্থিতি এসব যাত্রাকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলছে।
তথ্যসূত্র: মিসরে বাংলাদেশ দূতাবাস, স্থানীয় পুলিশ, জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য ও স্থানীয় গণমাধ্যম।