সাগরকন্যা স্পোর্টস ডেস্ক
নাহিদ রানা চোটে পড়েছেন, শরিফুল ইসলামও ইনজুরিতে। অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণ যখন একের পর এক ধাক্কায় বিপর্যস্ত, তখন শঙ্কার মেঘই ঘন হয়ে উঠেছিল। লঙ্কান প্রিমিয়ার লিগে (এলপিএল) চুক্তিবদ্ধ হয়েও চোটের আশঙ্কায় শ্রীলঙ্কায় যাননি তাসকিন আহমেদ। কাউন্টি থেকে এলপিএল খেলতে যাওয়া হাসান মাহমুদও দলের প্রয়োজনে টুর্নামেন্ট শেষ না করেই দেশে ফিরে যোগ দেন জাতীয় দলের সঙ্গে।
একইভাবে এলপিএলে গল গ্ল্যাডিয়েটর্সকে চ্যাম্পিয়ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মেহেদী হাসান মিরাজও দলের প্রয়োজনেই দেশে ফিরে আসেন। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে এই দুই ক্রিকেটারই হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নায়ক। আর ব্যাট হাতে তাদের সঙ্গে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন তানজিদ হাসান তামিম।
ডারউইনের মারারা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। এই জয়ের নেপথ্যে হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিং, মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স এবং তানজিদ হাসান তামিমের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি-তিনটি পারফরম্যান্সই আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে।
প্রস্তুতি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট একাদশের কাছে বাংলাদেশের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর মূল ম্যাচ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তার ওপর টস জিতে অস্ট্রেলিয়া ব্যাটিং নেওয়ায় চাপটা আরও বাড়ে। কিন্তু শুরু থেকেই সেই চাপকে উল্টো অস্ট্রেলিয়ার ওপর ফিরিয়ে দেন হাসান মাহমুদ।
প্রথম ইনিংসে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করে ৬ উইকেট নেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকারের কীর্তিও গড়েন তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তার তৃতীয় পাঁচ উইকেট শিকার, আর তিনটিই দেশের বাইরে। হাসানের দুর্দান্ত বোলিংয়ের সামনে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস থামে ১৯৮ রানে।
তার সঙ্গে কার্যকর ভূমিকা রাখেন তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন। অস্ট্রেলিয়ার রান কিছুটা বাড়িয়ে দেন স্টিভেন স্মিথ। তানজিদ হাসান তামিমের হাতে পাওয়া একটি ক্যাচের সুযোগ কাজে লাগিয়ে শেষ পর্যন্ত ৭১ রান করেন স্মিথ। তা না হলে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের সংগ্রহ আরও কম হতে পারত।
এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ইতিহাস লেখেন তানজিদ হাসান তামিম। মাত্র ২ রানে জীবন পাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাননি তিনি। নাথান লায়নের হাতে ক্যাচ ছাড়ার সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যাটিং করে পৌঁছে যান তিন অঙ্কে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে টেস্ট সেঞ্চুরি করেন তানজিদ। তার ১০১ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশের ৪২৬ রানের বড় সংগ্রহ গড়ার ভিত তৈরি করে দেয়।
তানজিদের পর বাংলাদেশের ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজ। মুমিনুল করেন ৪৯, শান্ত ৮৪ এবং মিরাজ করেন ৬৫ রান।
তবে তানজিদের সেঞ্চুরির পাশাপাশি হাসান মাহমুদের ১৪ রানের ইনিংসটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ৮ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৪ রান করলেও ৯২ বল মোকাবিলা করেন তিনি। লম্বা সময় উইকেটে থেকে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের ক্লান্ত করে বাংলাদেশের ইনিংসকে বড় করার ক্ষেত্রে মূল্যবান ভূমিকা রাখেন এই পেসার।
এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে আবারও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে ধস নামান হাসান মাহমুদ। শুরুতেই দুই ওপেনারকে সাজঘরে ফেরান তিনি। জ্যাক ওয়েদারল্যান্ডকে শূন্য রানে বোল্ড করার পর বোল্ড করেন ট্রাভিস হেডকেও। পরে সেঞ্চুরিয়ান ক্যামেরন গ্রিনকেও বোল্ড করে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন হাসান।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে হাসানের বোলিং যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল, তা তার উইকেট নেওয়ার ধরনেই স্পষ্ট। দুই ইনিংস মিলিয়ে তার ধারাবাহিক আক্রমণ অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে শুরু থেকেই চাপে রাখে।
তবে বাংলাদেশের জয়ের গল্পে মেহেদী হাসান মিরাজের অবদানও কোনো অংশে কম নয়। প্রথম ইনিংসে ১৫৪ বল মোকাবিলা করে ৬৫ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দেন তিনি। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডদের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাট করে বাংলাদেশের সংগ্রহকে শক্ত ভিত দেওয়ার পর বল হাতেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন মিরাজ।
দ্বিতীয় ইনিংসে স্টিভেন স্মিথকে রিটার্ন ক্যাচে ফিরিয়ে দেন মিরাজ। এরপর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫ উইকেট শিকার করেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। মিরাজের ঘূর্ণির সামনে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস থামে মাত্র ৫৬ রানের লিডে।
ফলে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ের গল্পে তিনটি নাম আলাদা করে উচ্চারিত হবেই-হাসান মাহমুদ, মেহেদী হাসান মিরাজ ও তানজিদ হাসান তামিম।
হাসানের আগুনঝরা বোলিং, মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য আর তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি-এই তিন কাণ্ডারির অসাধারণ পারফরম্যান্সেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৯ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয় পেল বাংলাদেশ।