
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের পরিবারের অনুদানের অর্থ ব্যবহার করে দ্বিতীয় বিয়ে করার অভিযোগ উঠেছে তার বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশাসন গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মতিন রাজধানীর মতিঝিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। একমাত্র ছেলে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত হন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া সম্প্রতি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন আব্দুল মতিন। এ নিয়ে পরিবারে বিরোধ দেখা দিয়েছে। যদিও আব্দুল মতিনের দাবি, স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের ৭ নভেম্বর আব্দুল মতিন ও মমতাজ বেগমের বিয়ে হয়। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের পর দ্বিতীয় বিয়েকে কেন্দ্র করে তাদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।
শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন গত বছরের ১৮ জুলাই ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থেকে ২০ জুলাই তিনি মারা যান।
স্থানীয়দের দাবি, গত ২৯ মে সাত লাখ টাকা কাবিন ও প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন আব্দুল মতিন। ওই অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবারের সদস্যরা।
এ ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২ জুন তিনি মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যার চিন্তা করেছিলেন। পরে স্বজনরা বিষয়টি জানতে পেরে তাকে নিবৃত্ত করেন।
এদিকে, শহীদ শাহরিয়ারের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, অল্প সময়ের মধ্যে তার আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে।
শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম বলেন, সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠার আগেই আমার অনুমতি ছাড়াই আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আমার জানামতে বিয়েতে সোয়া ৫ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার কেনার সামর্থ্য তার নেই। আমার শহীদ ছেলের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই সরকারের দেওয়া অনুদানের টাকায় তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করছেন।
তিনি আরও বলেন, আমার ছেলের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর পর থেকেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য আমাকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে আসছিলেন। তিনি বারবার বলেছিলেন, আমার বংশ রক্ষার জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করতে হবে।
মমতাজ বেগমের অভিযোগ, ছেলে শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর তার নাম ব্যবহার করে নানা ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন আব্দুল মতিন। তিনি বলেন, আমি ২২ বছর তার সঙ্গে কাটিয়েছি। তার আর্থিক অবস্থা ভালো না।
তিনি আরও বলেন, শহীদ পরিবারকে দেওয়া সরকারি বরাদ্দের এককালীন ৩০ লাখ টাকা তিনি আমার সই জালিয়াতি করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি সচেতন থাকায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শুধু তাই নয়, আমার শহীদ ছেলের নাম ভাঙিয়ে আব্দুল মতিন বিভিন্ন সময় মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আমার এখন একটাই চাওয়া, মেয়েটাকে বড় করার আগে যেন আল্লাহ আমাকে নিয়ে না যায়। এ ঘটনার আমি সঠিক বিচারের দাবি জানাচ্ছি।
তবে অভিযোগ নাকচ করে আব্দুল মতিন বলেন, আমার বংশ রক্ষার জন্য আমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। বিশেষ করে আমার মায়ের অনুরোধে আমি বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি। এছাড়া বিয়ে করার আগে প্রথম স্ত্রী আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি এখন তা অস্বীকার করছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি আলফা গ্রুপের মতিঝিল শাখায় সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি। বিয়ে করার মতো সামর্থ্য আমার আছে। ছেলের অনুদানের টাকা দিয়ে বিয়ে করতে হবে, বিষয়টি এমনও নয়। বিয়ে করার পর আমি প্রথম স্ত্রীকে আনতে পাঁচবার বাসায় গিয়েছি। মেয়ের সঙ্গেও দেখা করতে পারিনি। সবশেষ অন্য একজনের মাধ্যমে তাদের বাসায় প্রবেশ করি। কিন্তু আমাকে অসম্মান করে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখন সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি।
নববধূর নাম ও পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে আব্দুল মতিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।