মতামতের কলাম প্রাথমিক শিক্ষায় পঠন সংকট; বাংলা-ইংরেজি দুর্বলতায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে

হোম » মতামত » মতামতের কলাম প্রাথমিক শিক্ষায় পঠন সংকট; বাংলা-ইংরেজি দুর্বলতায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে
শুক্রবার ● ২২ মে ২০২৬


ইউএনও মোঃ কাউছার হামিদ

ইউএনও মোঃ কাউছার হামিদ

 

বাংলাদেশকে যদি আমরা একটি উন্নত রাষ্ট্রের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে আমরা যেটি ব্যবহার করতে পারি, তা হলো শিক্ষা। নেলসন ম্যান্ডেলা-এর বক্তব্যেও আমরা দেখি- পৃথিবীকে পরিবর্তন করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হলো শিক্ষা। উন্নত রাষ্ট্রগুলোও তাদের উন্নয়নের জন্য মূলত শিক্ষাকেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেক্ষাপট যদি আমরা দেখি, সেখানে ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধকালীন সময়েও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পাননি। বর্তমান সময়েও দেশটিতে অভিভাবকরা তাদের আয়ের বড় একটি অংশ শিক্ষার জন্য ব্যয় করেন।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের সংবিধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা হয়েছে। পাশাপাশি অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে মিড-ডে মিল চালু করা হয়েছে এবং ড্রেস, ব্যাগসহ বিভিন্ন উপকরণও প্রদান করা হচ্ছে।

 

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি পড়ার দক্ষতা সন্তোষজনক নয়। অনেক শিক্ষার্থীই বাংলা ও ইংরেজি সাবলীলভাবে পড়তে পারে না। ফলে তারা যখন মাধ্যমিক পর্যায়ে যায়, তখনও এই দুর্বলতা থেকে যায়।

 

লাকসাম উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলাম। সেই প্রতিযোগিতা ক্লাস্টার পর্যায় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যে বিদ্যালয়টি প্রথম হয়েছিল, সেই বিদ্যালয়েরও প্রায় ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারেনি। অর্থাৎ, পুরো এলাকার মধ্যে সবচেয়ে ভালো হিসেবে বিবেচিত বিদ্যালয়ের অবস্থাই যদি এমন হয়, তাহলে প্রান্তিক এলাকার অন্যান্য বিদ্যালয়ের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়।

 

বিভিন্ন জাতীয় ও গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পাঠে দুর্বল এবং প্রায় ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি পাঠে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। (সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)

 

বর্তমানে কলাপাড়া উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, উপকূলীয় এই উপজেলার ধুলাসার, লতাচাপলী, লালুয়া, চম্পাপুরসহ একেবারে প্রান্তিক এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা অনেক কম।

 

এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারিকরণ করা রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। আবার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটও রয়েছে।

একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে লেখক

 

এছাড়া অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতার অভাব দেখা যায়। প্রান্তিক এলাকার অনেক অভিভাবক মাছ ধরা কিংবা কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকেন। ফলে সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি তারা প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে পারেন না।

 

ফলে অনেক শিশু বিদ্যালয়ে এলেও বাংলা ও ইংরেজি পড়ার মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। আমরা তাদের গণিতসহ অন্যান্য বিষয় শেখানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু পঠন দক্ষতার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

একটি বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক আমাকে জানান, তাদের বিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি পড়তে পারে। এর অর্থ হলো, মাধ্যমিক পর্যায়েও অর্ধেক শিক্ষার্থী ইংরেজি পড়তে সক্ষম নয়। বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, সমস্যার শিকড় প্রাথমিক স্তরেই রয়ে গেছে।

 

উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং উপজেলা শিক্ষা অফিস- সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় প্রাথমিক শিক্ষা, যা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি থেকেই যাবে।

 

সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে বই দিচ্ছে, বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করছে এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে। তারপরও কেন এই ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে, সেটি আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

 

এই সংকট থেকে আমরা যদি উত্তরণ ঘটাতে না পারি, তাহলে আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। মানসম্মত শিক্ষার্থী তৈরি ব্যাহত হবে এবং শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখিতাও কমে যেতে পারে।

 

লেখক: কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পটুয়াখালী

বাংলাদেশ সময়: ১৮:১০:১৯ ● ২৫ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ