পায়রা নদীতে ইলিশ স্বল্পতার নেপত্থে ডুবোচর!

প্রথম পাতা » বরগুনা » পায়রা নদীতে ইলিশ স্বল্পতার নেপত্থে ডুবোচর!
মঙ্গলবার ● ২ আগস্ট ২০২২


পায়রা নদীতে ইলিশ স্বল্পতার নেপত্থে ডুবোচর!

আমতলী (বরগুনা) সাগরকন্যা প্রতিনিধি॥

ইলিশ ভরা মৌসুমেও পায়রা নদীতে কাঙ্খিত রুপালী ইলিশের দেখা নেই। সাগর মোহনায় ডুবো চরে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে ইলিশ উল্টোপথে ফিরে যায়। ফলে পায়রা নদীতে ইলিশ প্রবেশ এবং প্রজননে বাঁধা সৃষ্টি করে বলে জানান মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মোঃ আনিছুর রহমানের। পায়রা নদীতে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা না পরায় উপকুলের ১৪ হাজার ৬’শ ৮৯ জেলে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সাগর মোহনার ডুবো চর খনন করে পায়রা নদীতে ইলিশ প্রবেশ ও প্রজনন কার্যক্রম সুগত করার দাবী জানিয়েছেন জেলেরা।
জানাগেছে, বুড়িশ্বর বা পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদী বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। তিন নদীর মোহনাকে জেলেদের ভাষায় গাঙ্গের আইল বলা হয়। বঙ্গোপসাগরের মিলিত হওয়া বিষখালী-বলেশ্বর মোহনায় লালদিয়া সমুদ্র সৈকত এবং পায়রা-বিষখালীর মোহনায় পদ্মাবাবুগঞ্জচর। ২০০৭ সালের প্রলঙ্ককারী ঘুর্ণিঝড় সিডরে নদী গতিপথ হারিয়ে তিন নদীর মোহনায় ডুবো চরের সৃষ্টি হয়। এ চর স্বাভাবিক জোয়ারের পানি প্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি করে। ফলে নদীর গভীরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। পায়রা-বিষখালী নদীর মোহনায় রয়েছে বড়াইয়্যার ডুবো চর। ১৫-২০ কিলোমিটার জুড়ে এ চর ফকির হাট থেকে শুরু করে আশার চরে মিলিত হয়েছে। এ চরটি বঙ্গোপসাগর থেকে পায়রা নদীতে জোয়ারের পানি প্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি করে। আশার চরের শেষ সীমানা থেকে শুরু হয়েছে নলবুনিয়ার ডুবো চর। এ চরের বিস্তৃতি ৭-৮ কিলোমিটার। এ ডুবো চরটি পায়রা নদীর প্রবেশ দ্বারে অবস্থিত। পায়রার প্রবেশ মুখ অতিক্রম করে ৩-৪ কিলোমিটার পরে পরপর পদ্মা ও কুমিরমারা ডুবো চর । এ চরের বিস্তৃতি ৬-৭ কিলোমিটার। এ চরে পরন্ত ভাটায় লোকজন হাটাচলা করে। জেলেরা খুটা গেরে জাল ফেলে। জোয়ারের সময় এ ডুবো চরে প্রচন্ড তুফান হয়। সাগর মোহনার ডুবো চরের কারনে জোয়ারের প্রথম ভাগে পায়রা নদীতে তীব্র গতিতে পানি প্রবেশ করতে পারে না। ওই সময়ে ইলিশ নদীতে প্রবেশের মুল সময় থাকলেও ডুবো চরে বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে ইলিশ উল্টো পথে ফিরে যায়। জোয়ারের মধ্যভাগে এসে তীব্র গতিতে পায়রা নদীতে পানি প্রবেশ করলেও ওই সময়ে ইলিশের প্রভাব কমে যায়। ওই সময়ে তেমন ইলিশ পায়রা নদীতে প্রবেশ না করায় জেলেদের জালে ইলিশের দেখা মিলছে না।
উপকুলীয় অঞ্চল আমতলী ও তালতলীতে ১৪ হাজার ৬’শ ৮৯ জন নিবন্ধনধারী জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে আমতলীর ৬ হাজার ৭’শ ৮৯ এবং তালতলীর ৭ হাজার ৯’শ জেলে। এরা দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করেন। উপকুলীয় অঞ্চলের গভীর সাগরে, সাগরের কিনারে এবং সাগরের শাখা প্রশাখা নদীতে তিন শ্রেনীর জেলে মাছ শিকার করেন। ইলিশের ভরা মৌসুম আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র ও আশি^ন মাস। এ চার মাসে জেলেরা মাছ শিকার করে সারা বছরের হিসেব চুকিয়ে নেয়। ইতিমধ্যে ইলিশ মৌসুমের দের মাস অতিবাহিত হয়েছে।  কিন্তু ভরা মৌসুম হলেও পায়রা নদীর জেলেদের জালে কাঙ্খিত ইলিশ ধরা পরছে না। এতে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। ছিটে খাটে দু’একটি যা পড়ছে তা দিয়ে সংসার চলে না বলে জানান জেলে ছত্তার।
সাগর সংলগ্ন নলবুনিয়া গ্রামের জেলে আলমগীর হাওলাদার বলেন, সাগর মোহনায় ডুবো চরের সুষ্টি হওয়ায় পায়রা নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের পানি প্রবেশে বাঁধা সৃষ্টি করে। এতে রুপালী ইলিশ পায়রায় প্রবেশ করতে পারে না। এ ডুবো চর খনন করে নদীর স্বাভাবিক গতি পথ ফিরে না  আনতে পারনে পায়রা নদীতে কাঙ্খিত ইলিশের দেখা মিলবে না। পায়রা নদীর জেলেদের রক্ষায় দ্রুত ডুবো চর খনন করা প্রয়োজন।
পায়রা নদীতে ইলিশ শিকারী জেলে ছত্তার, শহীদুল ইসলাম ও লাল মিয়া বলেন, জোয়ারের প্রথম ভাগে নদীতে তেমন ¯্রােত থাকে না। ¯্রােত না থাকায় ইলিশ প্রবেশ করতে পারে না। জোয়ারের মধ্যভাগে নদীতে ¯্রােতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। ওই ¯্রােতের সাথে আসা ইলিশ আমাদের জালে ধরা দেয়। ফলে পায়রা নদীতে তেমন ইলিশের দেখা মিলছে না। তারা আরো বলেন, নদীর মোহনায় সৃষ্ট ডুবো চরগুলো খনন করলেই পায়রা নদীতে ইলিশের দেখা মিলবে।
তালতলী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, সাগর মোহনায় ডুবো চরের কারনে পায়রা নদীর নাব্যতা হারিয়েছে। এতে জোয়ারের ¯্রােতের তীব্রতা কমে যাওয়ায় ইলিশ প্রবেশে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। তাই তুলনামুলক ভাবে পায়রা নদীতে ইলিশ কম। পায়রা নদীর মোহনায় ডুবো চর খনন করে নদীর নব্যতা ফিরিয়ে আনতে পারলে ইলিশ প্রবেশ এবং প্রজননে কোন বাঁধা থাকবে না।
আমতলী উপজেলা মেরিন ফিশারিজ অফিসার সায়েদ মোঃ ফারাহ বলেন, ইলিশ সোজা পথে চলে কিন্তু সাগর সংলগ্ন পায়রা নদীর মোহনার ডুবো চরে ইলিশ বাঁধাপ্রাপ্ত হয়ে নদীতে ইলিশ প্রবেশ করছে না। উল্টে পথে ফিরে যাচ্ছে।  ডুবো চর স্বাভাবিক হলে এ সমস্যা থাকবে না।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষনা ইনস্টিটিউট নদী কেন্দ্র চাঁদপুর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক  ড. মোঃ আনিছুর রহমান বলেন, সাগর মোহনায় ডুবো চর তথা তীব্র নাব্যতা সঙ্কটে ইলিশ চলাচলা বাঁধাপ্রাপ্ত হয়। ইলিশ চলাচলে গভীর পানির প্রয়োজন কিন্তু ডুবো চরের কারনে নদীতে সেই পরিমান গভীরতা না থাকায় সাগর মোহনা দিয়ে ইলিশ প্রবেশ করতে পারেনা। ফলে নদীতে আঙ্খিত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, বৃষ্টিপাত ও পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে নদীতে ইলিশের আধিক্য বৃদ্ধি পাবে।

এমএইচকে/এমআর

বাংলাদেশ সময়: ২২:০২:২৫ ● ১৬ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ