
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে ভোটের অঙ্ক, সমীকরণ আর কৌশলী দর-কষাকষির রাজনীতি। এই নির্বাচনী হাটে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে তথাকথিত ‘ফ্যাসিস্ট ভোটারদের’ বাড়তে থাকা কদর।
যাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অভিযোগ, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই একসময় আন্দোলন-সংগ্রামের মাঠে প্রতিবাদের ঝড় উঠত, আজ তাঁদের কাছেই নরম সুরে হাজির হচ্ছেন প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা। ভোট নিশ্চিত করার তাগিদে আচরণ, ভাষা ও অবস্থানে স্পষ্ট নমনীয়তার ইঙ্গিত মিলছে প্রায় সব দলেই।
নির্বাচনী প্রচারণার চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সভা-সমাবেশে কড়া স্লোগান কিংবা আক্রমণাত্মক বক্তব্যের বদলে শোনা যাচ্ছে ‘ভাই-বোন’ সম্বোধন, সহানুভূতির ভাষা এবং সমঝোতার বার্তা। বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ফ্যাসিস্ট ভোটারদের উদ্দেশে নানা আশ্বাস দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে ‘অন্যায়’, ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ কিংবা ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল’ বলে উল্লেখ করে প্রকাশ্যেই নিন্দা জানানো হচ্ছে।
প্রার্থী ও কর্মীরা যুক্তি দিচ্ছেন- আওয়ামী লীগ করার কারণে সবাই অপরাধী হয়ে যায় না। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে মানবিক মনে হলেও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে- এই অবস্থান আদর্শিক পরিবর্তনের ফল নয়, বরং নিখাদ ভোটের হিসাব থেকেই নেওয়া।
বাস্তবতা হলো, অনেক আসনেই জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুবই সূক্ষ্ম। কয়েক শ কিংবা কয়েক হাজার ভোটই ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারে। সে কারণেই একসময় ‘অচ্ছুত’ বলে বিবেচিত ভোটার গোষ্ঠী আজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নির্বাচনী হাটে তাঁদের ঘিরে চলছে প্রকাশ্য ও গোপন দর-কষাকষি।
এই কদর কেবল বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয়ভাবে ভুরিভোজ, দাওয়াত, সৌজন্য সাক্ষাৎ, হাসিমুখে কুশল বিনিময়- সব মিলিয়ে চলছে ভোটের আশায় নানা আয়োজন। প্রার্থী ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ কর্মীরা কথিত ফ্যাসিস্ট ভোটারদের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এমনকি ভবিষ্যৎ দেখভালের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে। গোপনে-প্রকাশ্যে এই তোষামোদ নির্বাচনী রাজনীতিকে দিয়েছে এক নতুন রূপ।
তবে এই সমীকরণের আরেকটি দিকও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কথিত ফ্যাসিস্ট ভোটারদের একটি বড় অংশ বর্তমানে নিজ নিজ এলাকায় অনুপস্থিত। মামলা, আতঙ্ক, রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই এলাকা ছেড়ে রয়েছেন। ফলে বাস্তবে তাঁদের ভোট কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে হিসাব যত বড়ই হোক, মাঠের বাস্তবতায় তার প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে।
আরও একটি লক্ষণীয় বৈপরীত্য চোখে পড়ছে। একদিকে ভোটের স্বার্থে ফ্যাসিস্ট ভোটারদের প্রতি নমনীয়তা, অন্যদিকে মিছিল-মিটিং ও জনসভায় তাঁদের বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগ, সমালোচনা ও দোষারোপও অব্যাহত। অর্থাৎ একই রাজনৈতিক শক্তি একই সময়ে দুই ধরনের ভাষা ব্যবহার করছে- একটি ভোট টানার জন্য, আরেকটি নিজেদের মূল সমর্থক ধরে রাখার জন্য। এই দ্বৈতনীতি বর্তমান নির্বাচনী রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে- এই আপসের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাকে সুবিধা দেবে? আদর্শ, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির জায়গায় যদি কেবল ভোটের হিসাবই মুখ্য হয়ে ওঠে, তবে দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র কতটা শক্ত থাকবে? ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক অবস্থান একসময় দৃঢ় ছিল, তা যদি নির্বাচনের মৌসুমে শিথিল হয়ে যায়, তবে তার ভবিষ্যৎ প্রভাব কী হবে- এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।
তবে বর্তমান পরিবেশ-পরিস্থিতির বিবেচনায় আরেকটি সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় আসছে। কোথাও কোথাও ভোটাররা ‘মন্দের ভালো’ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন- এমন আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি ধারণাও জোরালো হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য আন্দোলন বা উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদের বদলে ব্যালটের মাধ্যমেই কিছু আসনে ঘটে যেতে পারে এক ধরনের নীরব বিপ্লব। এই বিপ্লব হবে না স্লোগানে, হবে না মিছিলে-হবে নিঃশব্দে, ভোটকেন্দ্রের পর্দার আড়ালে।
যেখানে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত রাজনৈতিক শক্তির ওপর অনাস্থা জমেছে, সেখানে ভোটাররা দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি, পরিবেশ, পরিস্থিতি ও স্থানীয় সমীকরণ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ফলে অনেক আসনেই পূর্বধারণার বাইরে গিয়ে ভোটের চিত্র পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সচেতন রাজনৈতিক মহল।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ফ্যাসিস্ট ভোটারদের কদর বেড়ে যাওয়া কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি- যেখানে আদর্শ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে বারবার জয়ী হচ্ছে স্বার্থই। কোন আসনে এই কৌশল ফল দেবে, আর কোথায় তা ব্যুমেরাং হবে- তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই নির্বাচনী হাটের দর-কষাকষি আগামী দিনের রাজনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চলেছে।
গ্রন্থনা:
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব, পিরোজপুর