
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ভোলা
পেটের ভেতরে প্রায় তিন লিটার জমাট রক্ত। রক্তচাপ এতটাই কমে গিয়েছিল যে মাপা যাচ্ছিল না। নাড়ির স্পন্দন ছিল দুর্বল, সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা। এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ২৪ বছর বয়সী গৃহবধূ রিয়া আক্তারের প্রাণ বাঁচিয়েছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা।
গত ২৬ অক্টোবর সকালে এ অস্ত্রোপচার করা হয়। উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের জটিল ও জীবনরক্ষাকারী অস্ত্রোপচার প্রথমবারের মতো সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তীব্র পেটব্যথা নিয়ে ওই দিন সকালে বাবা বশিরকে সঙ্গে নিয়ে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে আসেন রিয়া। তাঁর বাড়ি পার্শ্ববর্তী লালমোহন উপজেলার রায়চাঁদ ইউনিয়নে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাঁকে হাসপাতালের ওপরের তলায় নেওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসক ডা. হাসান মাহমুদ পরীক্ষা করে দেখেন, রক্তচাপ মাপা যাচ্ছে না এবং নাড়ির স্পন্দন অত্যন্ত দুর্বল। পেটে তীব্র ব্যথার কারণে তাঁকে স্পর্শ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ সময় তাঁর শরীর ক্রমেই ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিল।
রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়, তিনি রাপচার্ড একটোপিক প্রেগন্যান্সিতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ অবস্থায় জরায়ুর বাইরে, সাধারণত ফ্যালোপিয়ান টিউবে স্থাপিত গর্ভ ফেটে গিয়ে পেটের ভেতরে প্রাণঘাতী রক্তক্ষরণ হতে পারে। বাইরে থেকে রক্তপাত দেখা না গেলেও দ্রুত চিকিৎসা না পেলে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ডা. হাসান মাহমুদ বিষয়টি ডা. ইশতিয়াক আহমেদকে জানান। পরে গাইনি ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কুলসুম আক্তার লাবণীকে ডাকা হয়। রোগীকে পরীক্ষা করে তিনি জরুরি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
এ সময় সিনিয়র স্টাফ নার্সরা রোগীর দুই হাতে বড় আকারের ক্যানুলা স্থাপন করে শিরাপথে তরল দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। চিকিৎসকেরা স্বজনদের জানান, দ্রুত অস্ত্রোপচার না করলে রোগীর জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হতে পারে। স্বজনেরা অস্ত্রোপচারে সম্মতি দিলে দ্রুত রক্ত সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরে অ্যানেস্থেসিয়া কনসালট্যান্ট ডা. মনিরুজ্জামান রোগীকে পরীক্ষা করে অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি ও পরিস্থিতি স্বজনদের বুঝিয়ে বলেন। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে তাঁকে জরুরি অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়।
অস্ত্রোপচারের সময় পেট খুলে চিকিৎসকেরা ভেতরে বিপুল পরিমাণ জমাট রক্ত দেখতে পান। চিকিৎসকদের বর্ণনা অনুযায়ী, রক্তক্ষরণের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন লিটার। এত বেশি রক্তক্ষরণের পর রোগীর জীবন রক্ষা করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় আপাতত সংকট কাটিয়ে উঠেছেন রিয়া আক্তার। তবে তিনি এখনো পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নন। হাসপাতালে রেখে তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা চলছে। এ পর্যন্ত তাঁর শরীরে ছয় ব্যাগ রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সাহসী উদ্যোগে এ ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়েছে। দক্ষ ও আন্তরিক চিকিৎসক দল থাকলে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হবে। আমাদের লক্ষ্য, স্থানীয় পর্যায়েই মানুষকে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া, যাতে সংকটাপন্ন রোগীরাও উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ পান।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। তবে অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে।