
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পিরোজপুর
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও পেশাগত অসদাচরণসহ ২৪টি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি। একই সঙ্গে বিধিমোতাবেক পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান স্বাক্ষরিত স্মারক নম্বর ০৫.১০.৭৯১৪.০০০.০৭.০০১.২৬-৯৪২-এর মাধ্যমে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ওই নোটিশ জারি করা হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বরিশালের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪-এর ৫৩(২) বিধির আওতায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব একক স্বাক্ষরে পরিচালনা করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভর্তি ও বিভিন্ন খাত থেকে আদায় করা আনুমানিক ৭৯ লাখ ৪ হাজার ৩৩০ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ৩৯ লাখ ৯৭ হাজার ৭৫৪ টাকা উত্তোলন এবং নির্দিষ্ট সময়ে ২৪ লাখ ৬ হাজার ৫৭৬ টাকার হিসাব মেলাতে না পারার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সরকারি পিবিজিএসআই প্রকল্পের ৫ লাখ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যয় না করে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এতে ২০ জন সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রী, ৬ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছাত্রী, শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া উৎসে ভ্যাট ও আয়কর কর্তন না করে গত আড়াই বছরে সরকারের প্রায় ১২ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্ট্যাম্প আইন অমান্য করে নগদ ভাউচারে স্ট্যাম্প ব্যবহার না করেও লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
নোটিশে টাকার বিনিময়ে নির্ধারিত রোল নম্বরের বাইরে ছাত্রী ভর্তি, উপবৃত্তির টাকা শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ না করে আত্মসাৎ এবং বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয়ের বেঞ্চ ও টেবিল বাইরের এক হোটেল মালিকের কাছে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসা. সেলিনা আক্তারের বিয়ে, বয়স, গায়ের রং ও পোশাক নিয়ে অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগও আনা হয়েছে। পাশাপাশি সভাপতির অনুমোদন ছাড়া একক সিদ্ধান্তে সহকারী প্রধান শিক্ষককে বহিষ্কার এবং শিক্ষকদের বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা বেআইনিভাবে বন্ধ রাখার অভিযোগ রয়েছে।
নোটিশে উল্লিখিত অভিযোগগুলো বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধানমালা-২০২৪-এর ৫১(ক) থেকে ৫১(ঙ) বিধি এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নীতিমালা-২০২৬ অনুযায়ী অদক্ষতা, পেশাগত অসদাচরণ, কর্তব্যে অবহেলা, দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশে প্রাপ্তির ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত দণ্ড দেওয়া হবে না, তার কারণ জানাতে বলা হয়েছে। আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিতে চান কি না, তাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে বিধিমোতাবেক তদন্ত কমিটি গঠন করে পরবর্তী চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আটজন শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধ করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি তার কক্ষে তালা দিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক। পরে কক্ষের দরজায় পেরেক মেরে সেটি আটকে দেওয়া হয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষকের আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানসিক হয়রানি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালে কয়েকজন শিক্ষক সাক্ষ্য দেন। এর পর সাতজন সহকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের বিরোধ দেখা দেয়।
বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সাতজন শিক্ষকের বেতন বন্ধ করে রেখেছেন। তিনি স্বেচ্ছাচারিভাবে বিদ্যালয় পরিচালনা করে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক এস এম মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি বর্তমানে ছুটিতে আছি। শিক্ষকদের বেতন বন্ধ করার মূল কারণ তারা প্রাইভেট পড়ান। প্রশাসনিক কারণে সাময়িকভাবে বেতন-ভাতা বন্ধ করা হয়েছে। আমার কক্ষে তালা দেওয়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. হাসিবুল হাসান বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তাঁর অনিয়মের বিষয়ে শোকজ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’