
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, চরফ্যাশন (ভোলা)
শহরের ইট-পাথরের দেয়ালবন্দি জীবন যখন নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশটুকুও কেড়ে নেয়, তখন মন খুঁজে ফেরে একটু খোলা আকাশ, একটু দখিনা হাওয়া, একটু নির্মল স্পর্শ। সেই খোঁজেই আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, নারী-পুরুষ, শিশুরা ছুটে আসে চরফ্যাশনের মেঘনা নদীর তীরঘেঁষা ‘বেতুয়া প্রশান্তি পার্কে’- যেখানে গোধূলির লালিমা আর নদীর কলকল ধ্বনি মিলে এক অনন্য প্রশান্তির আবহ তৈরি করে।
পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্কজুড়ে নামে এক অন্যরকম মায়া। কাঁচা ঘাসের স্পর্শ, পলি মাটির গন্ধ আর নির্মল বাতাসে বসে বন্ধুরা খুলে বসে না বলা গল্পের ঝাঁপি। পুরনো কাসুন্দি, শৈশবের কানামাছি-গোল্লাছুট কিংবা জীবনের ব্যস্ততায় চাপা পড়ে থাকা অনুভূতিগুলো যেন এখানে নতুন করে প্রাণ পায়। নদীর স্বচ্ছ জলে ভেসে ওঠে ভালোবাসার গল্পও- কখনো প্রিয়জনকে না বলা কথার রূপ নেয় নিঃশব্দে, কখনো কবিতার পংক্তিতে।
জোৎস্নাস্নাত সন্ধ্যায় মেঘনাপাড় যেন আরেক জগৎ। নীরব-নিথর পরিবেশে বসে মানুষ খুঁজে ফেরে নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর উত্তর। প্রকৃতির সান্নিধ্যে স্রষ্টার সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ভাবনার দুয়ার খুলে যায়- নদীর স্রোত, চাঁদের আলো আর বাতাসের ছোঁয়ায় মন হয়ে ওঠে আরও ভাবুক, আরও গভীর।
কবি-সাহিত্যিক সিরাজ মাহমুদ বলেন, এ পার্কে পর্যটক, কবি, সাহিত্যিক, গবেষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ আসে। প্রকৃতির কাছ থেকে তারা তাঁদের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার উপাদান খুঁজে পান। অন্যদিকে নদীবাংলার কবি ও প্রভাষক রিপন শান জানান, বিষণ্ন মন নিয়ে এখানে এসে নির্মল হাওয়ায় সময় কাটালে মন ভালো হয়ে যায়; এখান থেকেই তিনি লেখালেখির রসদ সংগ্রহ করেন।
তবে আনন্দের পাশাপাশি কিছু অভিযোগও রয়েছে। মিজানুর রহমান নয়ন বলেন, ছুটির দিনসহ প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন। কিন্তু স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি পর্যটকদের হয়রানি করে অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে। তিনি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের টহল জোরদারের দাবি জানান।
চরফ্যাশন উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পূর্বে আয়েশাবাগ এলাকায় অবস্থিত এই পার্কটি এখন উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র। পরিবার, বন্ধু কিংবা একাকী- সব ধরনের মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে জায়গাটি। কেউ নদীর ধারে বসে জোৎস্নারাতে সময় কাটান, কেউবা খোলা আকাশের নিচে গল্প-উপন্যাস বা কবিতা লেখেন। শিশু-কিশোরদের হৈ-হুল্লোড়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এমাদুল হোসেন জানান, বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ঈদের পর থেকে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে।