বৃহস্পতিবার ● ২০ আগস্ট ২০২৬
মন্তব্য কলাম কুয়াকাটার ভালো গল্প আগে জানুক কুয়াকাটার মানুষ
হোম » মতামত » মন্তব্য কলাম কুয়াকাটার ভালো গল্প আগে জানুক কুয়াকাটার মানুষ

নাসির উদ্দিন বিপ্লব
কুয়াকাটাকে নিয়ে প্রচারের আগে কুয়াকাটার মানুষকেই জানতে হবে কুয়াকাটার ভালো গল্পগুলো। নিজের শহর, নিজের সৈকত, নিজের মানুষের আতিথেয়তা, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ, স্থানীয় খাবার, সংস্কৃতি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে আমরা যত বেশি জানব, তত বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরতে পারব।
কারণ কুয়াকাটার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রচারক কোনো বাইরের মানুষ নন- কুয়াকাটার মানুষ নিজেই।
বাইরে থেকে কেউ এসে কুয়াকাটার সৌন্দর্য নিয়ে যতই লিখুন, যতই ছবি বা ভিডিও তৈরি করুন, একজন স্থানীয় মানুষের নিজের অভিজ্ঞতার মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রচারণা আর কিছু হতে পারে না। একজন স্থানীয় তরুণ যখন নিজের চোখে দেখা সূর্যাস্তের ছবি তুলে বলেন, ‘এটাই আমাদের কুয়াকাটা’; একজন উদ্যোক্তা যখন স্থানীয় কোনো পণ্যের গল্প বলেন; একজন পর্যটন গাইড যখন কুয়াকাটার অজানা কোনো জায়গার কথা জানান; কিংবা একজন বাসিন্দা যখন বলেন, ‘এখানে রাতে পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে ঘুরে বেড়ানো যায়’- তখন সেই কথার মধ্যে থাকে নিজের অভিজ্ঞতার শক্তি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই শক্তিটিই কুয়াকাটার কাজে লাগাতে হবে।
কুয়াকাটার প্রতিটি মানুষকে ভাবতে হবে, তাঁর একটি ভালো ছবি, একটি ছোট ভিডিও কিংবা কয়েক লাইনের একটি ইতিবাচক লেখা হয়তো অন্য একজন মানুষকে কুয়াকাটায় আসতে আগ্রহী করে তুলতে পারে। একটি পোস্ট একজন পর্যটককে কুয়াকাটায় আসতে উৎসাহিত করতে পারে। সেই পর্যটক হোটেলে থাকবেন, রেস্তোরাঁয় খাবেন, স্থানীয় যানবাহন ব্যবহার করবেন, গাইড নেবেন, স্থানীয় পণ্য কিনবেন। অর্থাৎ একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে একটি পরিবারের আয়-রোজগার পর্যন্ত।
তাই কুয়াকাটার তরুণদের শুধু বিনোদনমূলক কনটেন্ট নয়, কুয়াকাটার ইতিবাচক গল্পও তৈরি করতে হবে। পর্যটন ব্যবসায়ীদের শুধু ব্যবসার বিজ্ঞাপন নয়, ভালো সেবার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে হবে। উদ্যোক্তাদের স্থানীয় পণ্য ও মানুষের গল্প বলতে হবে। গাইডদের কুয়াকাটার প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গল্প ছড়িয়ে দিতে হবে। আর সাধারণ বাসিন্দারাও তাঁদের নিজের চোখে দেখা ভালো দিকগুলো তুলে ধরতে পারেন।
বিশেষ করে কুয়াকাটার নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা সামনে আসা দরকার। নারী-পুরুষ, পরিবার কিংবা বন্ধুদের দল রাতেও কুয়াকাটায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন- এমন বাস্তব ছবি ও অভিজ্ঞতা পর্যটকদের মনে আস্থা তৈরি করতে পারে। পর্যটকদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের ভালো আচরণ, সহযোগিতা এবং স্বাভাবিক পরিবেশও তুলে ধরা যেতে পারে।
তবে ইতিবাচক প্রচারণার অর্থ কোনো সমস্যা লুকিয়ে রাখা নয়। সমস্যা হলে সেটি সত্য ও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যায়। কিন্তু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে পুরো কুয়াকাটাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করলে তার ক্ষতি হয় স্থানীয় মানুষেরই। কারণ কুয়াকাটার পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবার ও মানুষের জীবিকা।
একজন পর্যটক যখন কুয়াকাটায় আসেন, তিনি শুধু একটি হোটেলের অতিথি নন। তাঁর ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হন হোটেলকর্মী, রেস্তোরাঁকর্মী, গাড়ি বা ভ্যানচালক, গাইড, দোকানি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্থানীয় পণ্য বিক্রেতা। পর্যটক বাড়লে তাঁদের আয় বাড়ে; পর্যটক কমলে তার প্রভাবও পড়ে তাঁদের জীবনে।
তাই কুয়াকাটার ভালো গল্প জানা এবং সেই গল্প বলা শুধু প্রচারণা নয়- এটি স্থানীয় অর্থনীতির অংশ।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি কুয়াকাটা এবং এর আশপাশের ভালো দিকগুলো নিজেরাই জানি? জানলে কি সেগুলো নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরি?
এই জায়গাতেই আমাদের পরিবর্তন দরকার।
কুয়াকাটার প্রতিটি মানুষ যদি নিজের জায়গা থেকে একটি ভালো গল্প বলেন, তাহলে হাজারো গল্প মিলে তৈরি হবে কুয়াকাটার একটি শক্তিশালী ইতিবাচক পরিচয়। বাইরে থেকে বড় কোনো প্রচারণা চালানোর আগেই কুয়াকাটার মানুষের ফেসবুক পোস্ট, ছবি, ভিডিও ও অভিজ্ঞতা দেশের মানুষের মনে কুয়াকাটার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
কুয়াকাটার মানুষ হিসেবে আগে কুয়াকাটার ভালো গল্প জানার চেষ্টা করি, তারপর সেই গল্প জানাই পৃথিবীকে।
কারণ কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন কোনো বিলবোর্ড নয়, কোনো পেইড ক্যাম্পেইনও নয়।
কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হতে পারে কুয়াকাটার মানুষের নিজের চোখে দেখা, নিজের মুখে বলা কুয়াকাটার গল্প।
লেখক: কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি
বাংলাদেশ সময়: ১১:৩৮:৪৪ ● ২২ বার পঠিত
