বুধবার ● ৮ জুলাই ২০২৬

রূপসী কুয়াকাটা: যেখানে সাগর প্রতিদিন নতুন গল্প শোনায়

হোম » ফিচার » রূপসী কুয়াকাটা: যেখানে সাগর প্রতিদিন নতুন গল্প শোনায়
বুধবার ● ৮ জুলাই ২০২৬


 

রূপসী কুয়াকাটা: যেখানে সাগর প্রতিদিন নতুন গল্প শোনায়

নাসির উদ্দিন বিপ্লব 

 

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি ধীরে ধীরে সোনালি আভায় রাঙতে শুরু করেছে। দিগন্তরেখা ভেদ করে সূর্য উঠছে, আর একের পর এক ঢেউ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে বালুকাবেলা। দূরে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া ছুটে বেড়াচ্ছে নিজেদের ছন্দে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের নাম ‘কুয়াকাটা’। বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত, যেখানে একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগ মেলে।

কুয়াকাটা নামটি শুনলেই ভ্রমণপিপাসু মানুষের মনে এক ধরনের টান অনুভূত হয়। দেশের দক্ষিণ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এই জনপদ শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার এক অনন্য মিলনভূমি। বছরের প্রতিটি ঋতুতেই কুয়াকাটা নতুন রূপে ধরা দেয়, তবে বর্ষা শেষে ও শরৎকালে এর সৌন্দর্য যেন বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে থাকে সাদা ঝিনুকের খোলস। সমুদ্রের গর্জন, দক্ষিণা বাতাস আর বিস্তীর্ণ আকাশ মিলে তৈরি করে এক মায়াবী পরিবেশ। এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, প্রকৃতি যেন উদার হাতে তার সব সৌন্দর্য একসঙ্গে বিলিয়ে দিয়েছে।

সন্ধ্যার কুয়াকাটা যেমন মোহময়, তেমনি রাতের কুয়াকাটাও অন্যরকম। বিশেষ করে ভাদ্রের নির্মল রাতে সাগরের বুক থেকে চাঁদের ধীরে ধীরে উত্থান এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। চাঁদের রুপালি আলো যখন ঢেউয়ের গায়ে ঝিলিক তোলে, তখন সমুদ্র যেন রূপকথার কোনো রাজ্যে পরিণত হয়। যারা একবার এই দৃশ্য দেখেছেন, তারা জানেন এর মুগ্ধতা ভাষায় প্রকাশ করা কত কঠিন।

খাদ্যরসিকদের কাছেও কুয়াকাটার আলাদা আবেদন রয়েছে। সাগরপাড়ের রেস্তোরাঁগুলোতে পাওয়া যায় সদ্য ধরা রুপালি ইলিশ। সরষে বাটা ইলিশের ঘ্রাণ সহজেই পর্যটকদের টেনে নেয় খাবারের টেবিলে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ও উপকূলীয় খাবারের সমাহার। শুঁটকিপ্রেমীদের জন্যও কুয়াকাটা এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। স্থানীয় বাজারগুলোতে সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যায় নানা ধরনের শুঁটকি, যা অনেক পর্যটক স্মারক হিসেবেও সঙ্গে নিয়ে যান।

কুয়াকাটার ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রাখাইন সম্প্রদায়ের নাম। প্রায় আড়াই থেকে তিনশ বছর আগে আরাকান অঞ্চল থেকে নৌপথে এসে তারা এখানে বসতি স্থাপন করেন। লোককথা ও ইতিহাস বলছে, সুপেয় পানির সন্ধানে তারা এ অঞ্চলে কূপ বা ‘কুয়া’ খনন করেছিলেন। সেই ‘কুয়া’ থেকেই জন্ম নেয় ‘কুয়াকাটা’ নামটি। আজও সেই ইতিহাসের স্মৃতি সংরক্ষিত রয়েছে।

রাখাইন সংস্কৃতি কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণ। কাঠের তৈরি টংঘর, বর্ণিল পোশাক, নিজস্ব তাঁতে বোনা কাপড় এবং ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা পর্যটকদের কাছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা এনে দেয়। রাখাইন মার্কেটে গেলে দেখা যায় রঙিন কাপড়, শীতবস্ত্র ও হস্তশিল্পের বাহারি সম্ভার। স্থানীয় রাখাইন নারীদের হাতে তৈরি এসব পণ্যে ফুটে ওঠে তাদের ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতা।

ধর্মীয় ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও কুয়াকাটা সমৃদ্ধ। এখানে অবস্থিত বৌদ্ধবিহারগুলোতে রয়েছে গৌতম বুদ্ধের বিশাল মূর্তি। স্নিগ্ধ ও শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এসব বিহার শুধু ধর্মীয় গুরুত্বই বহন করে না, বরং দর্শনার্থীদের মনে আনে প্রশান্তির অনুভূতি।

সাগরের পাশাপাশি কুয়াকাটার আরেক আকর্ষণ ঝাউবন। সবুজে ঘেরা এই বনভূমিতে প্রবেশ করলেই যেন বদলে যায় পরিবেশ। গাছের ছায়া, পাখির কলতান আর সমুদ্রের বাতাস মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম প্রশান্তি। পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানো, পিকনিক, আলোকচিত্র ধারণ কিংবা নিভৃতে প্রকৃতিকে অনুভব করার জন্য এটি আদর্শ স্থান।

নাটক, সিনেমা কিংবা মিউজিক ভিডিও নির্মাণের জন্যও কুয়াকাটা দীর্ঘদিন ধরে নির্মাতাদের পছন্দের জায়গা। সমুদ্র, বন, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের বৈচিত্র্যময় দৃশ্যপট এখানে একসঙ্গে পাওয়া যায়। তাই ক্যামেরার চোখেও কুয়াকাটা সমান আকর্ষণীয়।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, সমুদ্রের বিশালতা, রাখাইন সংস্কৃতির ঐতিহ্য, সুস্বাদু খাবার আর মানুষের আন্তরিকতায় কুয়াকাটা আজ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। এখানে একবার এলে শুধু সমুদ্র দেখা হয় না; দেখা হয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনকে। আর সে কারণেই কুয়াকাটা বারবার ডাকে- ঢেউয়ের শব্দে, বাতাসের স্পর্শে, সূর্যের রঙে আর চাঁদের আলোয়।

কুয়াকাটা তাই শুধু একটি জায়গার নাম নয়; এটি এক অনুভূতির নাম, এক মুগ্ধতার নাম, এক অনন্ত ফিরে আসার গল্প।

বাংলাদেশ সময়: ৭:১১:২২ ● ২০ বার পঠিত