
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বাউফল (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর বাউফলে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমপিও সুবিধা বহাল রাখতে অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অন্য একটি বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ছাড়পত্র এনে নিজ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানো হয়েছে। এমনকি ওইসকল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের নাম মো. আলাউদ্দিন। তিনি উপজেলার দাশপাড়া ইউনিয়নের চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে এ অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, মফস্বল বা পল্লী এলাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ন্যূনতম ৫০ জন পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এবং কমপক্ষে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে পাস করতে হয়। কিন্তু চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয় কয়েক বছর ধরেই এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টি থেকে ২২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। পাসের হার ছিল ৪৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে ২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে মাত্র ৮ জন। পাসের হার নেমে আসে ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশে। আর চলতি ২০২৫ সালের পরীক্ষায় ২২ জন অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র একজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংকট, দুর্বল পাঠদান এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা চলছিল। ফলে এমপিও সুবিধা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সেই সংকট কাটাতে এবার অন্য বিদ্যালয়ের ফেল করা শিক্ষার্থীদের এনে পরীক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার পূর্ব কালাইয়া হাসান সিদ্দিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া অন্তত ১৫ শিক্ষার্থীকে ছাড়পত্র দিয়ে চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্থানান্তর দেখিয়ে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করানো হয়। এ জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে জানানো হয়।
একাধিক শিক্ষার্থী সাগরকন্যাকে জানান, তারা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পূর্ব কালাইয়া হাসান সিদ্দিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করায় তাদের ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করেছেন।
চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী মো. নাইম বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অনেকে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছিল। পরে বলা হয়, পরীক্ষা দিতে চাইলে চর আলগী স্কুল থেকে ফরম পূরণ করতে হবে। আমরা ১৬ জন ৮ হাজার টাকা করে দিয়েছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা যারা সাত বিষয়ে ফেল করেছি, তারাও ফরম পূরণ করতে পেরেছি, কেবল বাধ্য করা হয়েছে অন্য স্কুলে যেতে।’
শিক্ষার্থীদের দাবি, সরকার মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ফরম পূরণ ফি নির্ধারণ করেছে ২ হাজার ৩১৫ টাকা। রেজিস্ট্রেশন ও মাইগ্রেশন বাবদ আরও প্রায় ৭০০ টাকা লাগে। অথচ তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৮ হাজার টাকা। এমনকি প্রবেশপত্র দেওয়ার সময়ও অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়।
এ বিষয়ে পূর্ব কালাইয়া হাসান সিদ্দিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কামাল আজাদ বলেন, ‘টেস্ট পরীক্ষায় ৬৭ জন অংশ নেয়। এর মধ্যে ২০ জন সব বিষয়ে ফেল করায় তাদের ফরম পূরণ করা হয়নি। পরে তাদের মধ্যে ১৫ জন ছাড়পত্র নিয়ে অন্য বিদ্যালয় থেকে ফরম পূরণ করেছে।’ তবে শিক্ষার্থীদের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
অন্যদিকে চর আলগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘নিয়ম মেনেই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মাধ্যমে ফরম পূরণ করা হয়েছে।’ অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বোর্ডসহ বিভিন্ন খরচ থাকায় বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে।’
পটুয়াখালী জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহা. মুজিবুর রহমান এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’কেকে/এমআর