বুধবার ● ১ এপ্রিল ২০২৬

কলাপাড়ায় মাদকের বিস্তার: অভিযান নয়, দরকার সামাজিক প্রতিরোধ

হোম পেজ » সম্পাদকীয় » কলাপাড়ায় মাদকের বিস্তার: অভিযান নয়, দরকার সামাজিক প্রতিরোধ
বুধবার ● ১ এপ্রিল ২০২৬


 

সাগরকন্যা সম্পাদকীয়

কলাপাড়া-কুয়াকাটা অঞ্চলে মাদকের বিস্তার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি দৃশ্যমান সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। ইয়াবা ও গাঁজার সহজপ্রাপ্যতা, উপকূলীয় ভৌগোলিক সুবিধা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় কিছু অসাধু চক্রের কারণে এই অঞ্চল মাদক প্রবাহের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হচ্ছে। বুধবার ভোররাতে বিশেষ অভিযানে তিনজনকে গ্রেফতার এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে এনেছে।

 

মাছুয়াখালীর মতো প্রত্যন্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা ও গাঁজাসহ দুই মাদককারবারি এবং একজন মাদকসেবীকে আটক করা নিঃসন্দেহে প্রশাসনের সক্রিয় অবস্থানের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উত্থাপন করে- মাদক কীভাবে এত গভীরে প্রবেশ করছে, যেখানে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশও এর ঝুঁকির বাইরে থাকছে না?

 

এই প্রশ্নের উত্তর এককভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাদক এখন শুধু অপরাধ নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ব্যাধি। একজন তরুণ যখন মাদকের সংস্পর্শে আসে, তখন তার শিক্ষা, কর্মসংস্থান সম্ভাবনা, পারিবারিক স্থিতি এবং সামাজিক অবস্থান- সবই ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। কলাপাড়ার মতো সম্ভাবনাময় ও কুয়াকাটা পর্যটননির্ভর এলাকায় এই প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।

 

প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু অভিযান বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ, সরবরাহ কমানোর পাশাপাশি চাহিদা নিয়ন্ত্রণ না করলে এই চক্র বারবার ফিরে আসে। ফলে প্রতিরোধের ক্ষেত্রটি হতে হবে আরও বিস্তৃত ও সমন্বিত।

 

এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। স্কুল–কলেজ পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, তরুণদের জন্য বিকল্প বিনোদন ও কর্মসংস্থান সুযোগ বৃদ্ধি এবং পরিবারভিত্তিক নজরদারি- এই তিনটি দিক শক্ত না হলে মাদকের বিস্তার থামানো কঠিন হবে।

 

একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের কেবল অপরাধী হিসেবে নয়, অনেক ক্ষেত্রে রোগী হিসেবে বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গিও জরুরি। পুনর্বাসন ও চিকিৎসার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে তারা বারবার একই চক্রে ফিরে যাবে, আর সমাজও এই অন্ধকার বলয় থেকে বের হতে পারবে না।

 

কলাপাড়া-কুয়াকাটার বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। অভিযান চলবে, শাস্তিও হবে- কিন্তু তার পাশাপাশি যদি সামাজিক প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের শক্ত ভিত্তি তৈরি না হয়, তবে এই সংকট আরও গভীর থেকে গভীরতর হবে।

বাংলাদেশ সময়: ১১:০০:২২ ● ৩৭ বার পঠিত