সোমবার ● ৩০ মার্চ ২০২৬

এক কাপ চা, সাত স্তরের গল্প: রমেশ রাম গৌড়ের জীবনের স্বাদ

হোম পেজ » মুক্তমত » এক কাপ চা, সাত স্তরের গল্প: রমেশ রাম গৌড়ের জীবনের স্বাদ
সোমবার ● ৩০ মার্চ ২০২৬


 

সাত স্তরের চা, রমেশ রাম গৌড় ও তাঁর ছেলের সাথে লেখক

মো. বেল্লাল হাওলাদার 

চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠে- আমরা সাধারণত শুধু স্বাদ খুঁজি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছি, সেই এক কাপ চায়ের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে একটি জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, হার না মানা স্বপ্ন আর সাফল্যের স্তরে স্তরে গড়া গল্প?

 

শ্রীমঙ্গলে গিয়ে ঠিক এমনই এক গল্পের মুখোমুখি হলাম।

 

সবুজে মোড়া, চা বাগানের নীরবতায় ঢেকে থাকা এই জনপদে পা রাখলেই মনে হয়, শহুরে ক্লান্তি কোথাও হারিয়ে গেছে। বাতাসে চায়ের হালকা সুবাস, দূরে সারি সারি বাগান- প্রকৃতি যেন এখানে নিজেই নিজের গল্প বলে। কিন্তু সেই গল্পের মাঝেই আরেকটি গল্প অপেক্ষা করছিল- একজন মানুষের।

 

তিনি রমেশ রাম গৌড়।

 

প্রথম দেখায় খুব সাধারণ। কিন্তু তাঁর হাতের তৈরি চা একেবারেই অসাধারণ। স্বচ্ছ গ্লাসে স্তরে স্তরে সাজানো সাত রঙের চা- যেন চোখের সামনে এক শিল্পকর্ম। প্রতিটি স্তর আলাদা, তবুও একসঙ্গে তারা তৈরি করে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য। চুমুক দিলে বোঝা যায়- এটি শুধু চা নয়, এটি অভিজ্ঞতা।

 

কথা বলতে শুরু করতেই ধীরে ধীরে খুলে যায় তাঁর জীবনের পাতা।

 

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে শুরু। ছোট ব্যবসা ছিল, স্বপ্নও ছিল। কিন্তু প্রতারণা সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়। সব হারিয়ে ২০০০ সালে মাত্র দেড় হাজার টাকা নিয়ে পরিবারসহ চলে আসেন শ্রীমঙ্গলে। নতুন শহর, নতুন জীবন- কিন্তু সামনে অনিশ্চয়তা।

 

শুরুটা সহজ ছিল না। কখনো চাকরি, কখনো ছোট দোকান- সংগ্রামই ছিল একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু তিনি থামেননি।

 

চায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই শুরু হয় তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ২০০২ সালে তৈরি করেন দুই স্তরের চা। সেখান থেকেই শুরু। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে স্তর- তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত। প্রতিটি স্তরের পেছনে ছিল চেষ্টা, ব্যর্থতা আর আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস।

 

একসময় সেই চা পৌঁছে যায় দেশের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’-তে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

 

আজ শ্রীমঙ্গলের ‘নীলকণ্ঠ টি-কেবিন’ শুধু একটি দোকান নয়- এটি একটি গন্তব্য। দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ভিড় করেন, শুধু এক কাপ চায়ের জন্য। একটি ছোট উদ্যোগ কীভাবে একটি অঞ্চলের পরিচিতি বদলে দিতে পারে- তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন রমেশ রাম গৌড়।

 

তবে তাঁর গল্প শুধু সাফল্যের নয়, মানবিকতারও।

 

এই প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে তিনি সহায়তা করেন এতিমখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে। নিজের সাফল্যকে তিনি একা ভোগ করেন না- ভাগ করে নেন সমাজের সঙ্গে।

 

এখন তাঁর পরিবারই এই ঐতিহ্য বহন করছে। ছেলে রাজিব রাম গৌড়সহ অন্যরাও শিখে নিয়েছেন সেই বিশেষ কৌশল। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে এক কাপ চায়ের গল্প।

 

তবে সবকিছুর মাঝেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পর্যটকের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে পার্কিং সংকট, সরু সড়কে যানজট। পরিকল্পিত উন্নয়ন না হলে এই সৌন্দর্য একসময় ভোগান্তির কারণও হতে পারে।

 

তবুও, সবকিছু ছাপিয়ে রয়ে যায় এক সত্য-

 

রমেশ রাম গৌড় শুধু চা বানান না, তিনি গল্প বানান।

 

আর তাঁর সেই গল্প- এক কাপ চায়ের মতোই- স্তরে স্তরে খুলে যায়, ধীরে ধীরে, গভীরভাবে।

 

লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক

বাংলাদেশ সময়: ১৬:১৫:৩১ ● ৩৩ বার পঠিত