শুক্রবার ● ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আগুনঝরা ফাগুনে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে নাজিরপুরের শিমুল

হোম পেজ » ফিচার » আগুনঝরা ফাগুনে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে নাজিরপুরের শিমুল
শুক্রবার ● ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


 

আগুনঝরা ফাগুনে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে নাজিরপুরের শিমুল

আল-আমিন হোসাইন, নাজিরপুর (পিরোজপুর)

শীতের বিদায়ের পর ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে যখন দক্ষিণা বাতাসে আমের মুকুলের ঘ্রাণ ভেসে আসে, কোকিলের কুহুতানে জেগে ওঠে গ্রামবাংলা- তখনই চোখে পড়ার কথা পত্রশূন্য ডালে আগুনরাঙা শিমুলের সমারোহ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নাজিরপুর-এ একসময় বসন্তের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুল গাছ আজ নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে।

 

এক যুগ আগেও উপজেলার অধিকাংশ গ্রামে, বাড়ির আঙিনায়, খোলা মাঠে কিংবা সড়কের ঢালে দেখা মিলত সুউচ্চ শিমুলের। বসন্ত এলে পাতা ঝরানো ডাল জুড়ে ফুটত গাঢ় লাল ফুল- দূর থেকে মনে হতো আগুন জ্বলছে গাছের চূড়ায়। অন্য সবুজের ভিড়ে শিমুলের এই রক্তিম উপস্থিতি যেন প্রকৃতির স্বাক্ষর ছিল। এখন সেই দৃশ্য ক্রমেই বিরল।

 

শিমুলের বৈজ্ঞানিক নাম বোম্ব্যাক্স সাইবা; এটি মালভেসি পরিবারের উদ্ভিদ, যা অন্তর্ভুক্ত (পূর্বে বোম্বাকাসিয়াসি নামে পরিচিত)। সাধারণত বীজের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়। রোপণের ৬-৭ বছরের মধ্যে ফুল ফোটে এবং পূর্ণবয়স্ক গাছ ৯০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। অনুকূল পরিবেশে দেড়শ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার সক্ষমতা রয়েছে এ গাছের। শীত শেষে পাতা ঝরে যায়, বসন্তের শুরুতেই ফুটে ফুল; চৈত্রের শেষে ফল পাকে এবং বৈশাখে শুকিয়ে ফেটে তুলাসহ বীজ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে।

 

শুধু নান্দনিকতার জন্য নয়, অর্থনৈতিক ও ভেষজ গুরুত্বেও শিমুল অনন্য। এর তুলা বালিশ, লেপ ও তোষক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ছাল, পাতা ও ফুল গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে কাজে লাগে। গ্রামাঞ্চলে বিষফোঁড়া ও কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে শিমুলের মূল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে; আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায়ও বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়দের মতে, একটি বড় গাছ থেকে তুলা বিক্রি করে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব। বাজারে তুলার দাম বাড়লেও গাছ রোপণের উদ্যোগ বাড়েনি।

 

অতীতে নির্মাণকাজ, টুথপিক ও প্যাকিং বাক্স তৈরিতে এবং ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে নির্বিচারে শিমুল ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সমান্তরালে রোপণ না হওয়ায় কমে গেছে গাছের সংখ্যা। ফলে বসন্তের প্রাকৃতিক রূপ যেমন ফিকে হয়েছে, তেমনি পরিবেশেও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। সুউচ্চ শিমুল গাছে কাক, কোকিল, চিল ও বকসহ নানা পাখি বাসা বাঁধত। গাছ কমে যাওয়ায় এসব পাখি হারাচ্ছে আবাসস্থল।

 

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, আগে গ্রামজুড়ে শিমুল ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য; এখন তা স্মৃতির অংশ হয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে রোপণ ও সংরক্ষণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে শিমুল কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

 

প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শিমুলের মতো দেশীয় বৃক্ষ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন, পরিবেশবিদ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া আগুনঝরা ফাগুনের এই চিরচেনা প্রতীককে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। এখনই সচেতন না হলে আগামী প্রজন্ম হয়তো জানতেই পারবে না- বাংলার বসন্ত একসময় শিমুলের রক্তিম ছোঁয়ায় এমন উজ্জ্বল ছিল।

বাংলাদেশ সময়: ১৭:৫৬:১০ ● ৭১ বার পঠিত